মুক্তমত

দাও ফিরিয়ে সে অরণ্য লও হে নগর

এম আব্দুল মোমিন
পরিবেশ দিবস এলেই বিভিন্ন আলোচনা, সভা-সেমিনার ও প্রচারণার মাধ্যমে গণমানুষকে পরিবেশ দূষণ, তার কারণ, প্রভাব ও প্রতিকার বিষয়ে সচেতন করার চেষ্টা চালানো হয় কিন্তু সারা বছর আমরা প্রতিনিয়তই পরিবেশের প্রতি বিরূপ আচরণ অব্যাহত রাখি। বুঝে হোক, না বুঝে হোক নগর সভ্যতার বিকাশের নামে শিল্প-কলকারখানা গড়তে গিয়ে আমরা প্রতিনিয়ত নষ্ট করছি আমাদের পরিবেশের ভারসাম্য। এভাবে চলতে থাকলে মানবসভ্যতা শুধু বিপন্ন নয়, হারিয়ে যাওয়ার আশংকাও অমূলক নয়।

এই কথা মাথায় রেখেই পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গণসচেতনতা বৃদ্ধি এবং সম্মিলিত কার্যকর বৈশ্বিক পদক্ষেপ গ্রহণের লক্ষ্যে সর্বপ্রথম বড় আকারের সম্মেলন আয়োজন হয় ১৯৭২ সালে। সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমে ১৯৭২ সালে জাতিসংঘের উদ্যোগে পরিবেশ বিষয়ক এই আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। জাতিসংঘের মানবিক পরিবেশ সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক ওই সম্মেলনে গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রতি বছরের ৫ জুন ‘বিশ্ব পরিবেশ দিবস’ পালন করা হয়। আর প্রথম ‘বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালন করা হয় ১৯৭৩ সালে। জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির (ইউএনইপি) উদ্যোগে প্রতি বছর ৫ জুন সারা বিশ্বের ১০০ টিরও বেশি দেশে বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালন করা হয়। বাংলাদেশেও দিবসটি গুরুত্বের সাথে পালন করা হয়।

প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের এক অফুরন্ত ভাণ্ডার বাংলাদেশ। এ সম্পদ সংরক্ষণ করা আমাদের জাতীয় কর্তব্য। ভৌগোলিক অবস্থান ও মানবসৃষ্ট নানাবিধ প্রতিবন্ধকতার কারণে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের সম্মুখীন। জনসংখ্যার আধিক্য, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও শিল্পায়ন আমাদের পরিবেশ দূষণের মাত্রাকে ক্রমেই বাড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে ঝুঁকিপূর্ণ হচ্ছে খাদ্য নিরাপত্তা, বিপন্ন হচ্ছে জীববৈচিত্র্য। কবির আকুতি ‘দাও ফিরিয়ে সে অরণ্য লও হে নগর।’ এই আকুতির আবেদন আজ আরো বেশি প্রকট। আমাদের স্বেচ্ছাচরিতায় প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যে আজ হুমকির মুখে। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব বিশ্ববাসীর মনে স্থায়ী উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এ পরিবর্তনের সম্ভাব্য সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। তাই জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় বিশ্বব্যাপী পরিবেশ আন্দোলন জোরদারকরণ এবং এ আন্দোলনে বন্ধুপ্রতিম দেশগুলোকে সাথে নিয়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে উন্নয়নশীল বিশ্বের অনুকূলে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে বাধ্য করা প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত।

পরিবেশের সাথে মানবসভ্যতার সম্পর্ক কতটা নিবিড় তা ফুটে উঠেছে আজ থেকে ১শ’৬০ বছর আগে আমেরিকান ১৪তম প্রেসিডেন্ট ফ্র্যাংকলিন পিয়াস্রের’র কাছে আমেরিকার এক নাম না জানা রেড ইন্ডিয়ান সরদারের লেখা একটি চিঠিতে। ১৮৫৪ সালে, অ্যামেরিকার তৎকালীন রাষ্ট্রপতি সিয়াটলে বসবাসরত রেড ইন্ডিয়ানদের নির্দেশ দেন তারা যেন তাদের নিজেদের বসতি (সিয়াটল) ছেড়ে চলে যায়। কারণ সেখানে একটি আধুনিক সভ্য শহর গড়ে তোলা হবে। তখন সিয়াটলের সেই রেড ইন্ডিয়ান সর্দার আমেরিকার প্রেসিডেন্টকে আবেগময়ী ভাষায় যে চিঠিটি লিখেছিলেন সেখানে সরদার নিজেকে লাল মানুষ আর আমেরিকানদের সাদা মানুষ হিসেবে অভিহিত করেছেন। যার শিরোনাম ছিলো : ওয়াশিংটনের বড় সাদা সরদারের কাছে সিয়াটল উপজাতির প্রধানের চিঠি।

পরিবেশবাদী লেখক বিপ্রদাশ বড়ুয়ার তাঁর এক লেখায় সেই চিঠিটির যে বাংলা অনুবাদ তুলে ধরেছেন তা হলো: “কী করে তোমরা বেচাকেনা করবে আকাশ, ধরিত্রীর উষ্ণতা? আমরা তোমাদের চিন্তা বুঝতে পারিনা। বাতাসের সতেজতা, জলের ঝিকমিক আমরাতো এগুলোর মালিক নই, তবে তোমরা আমাদের থেকে এগুলো কিনবে কী করে? এই ধরিত্রীর প্রতিটি অংশই আমাদের লোকদের কাছে পবিত্র। পাইন গাছের প্রত্যেকটি চকচকে ডগা, বালুকাময় প্রতিটি সমুদ্রতট, অন্ধকার বনভূমিতে জমে থাকা কুয়াশা, প্রতিটি প্রান্তর, পতঙ্গের গুনগুন আমার লোকদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও স্মৃতিতে পবিত্র। প্রতিটা বৃক্ষের ভিতর দিয়ে যে বৃক্ষরস প্রবাহিত হচ্ছে তারা লাল মানুষদের স্মৃতি বয়ে নিয়ে চলেছে। সাদা মানুষদের মৃতেরা তাদের নিজেদের দেশকে ভুলে দূর আকাশের তারার কাছে স্বর্গে চলে যায়, আমাদের মৃতেরা এই সুন্দর পৃথিবীকে কখনও ভোলেনা, কেননা এই পৃথিবী লাল মানুষদের মা। আমরা এই ধরিত্রীর অংশ, এও আমাদের অংশ।

সুগন্ধ ফুলগুলো আমাদের বোন, হরিণ ঘোড়া বিশাল ঈগল পাখি, এরা সবাই আমাদের ভাই। পাহাড়ের পাথুরে সব গহবর, সরস মাঠ, ঘোড়ার বাচ্চার গায়ের যে উষ্ণতা আর মানুষ সবকিছু মিলে আমাদের একই পরিবার। তোমরা আমাদের বল যে তোমরা আমাদের দেশ নিবে আর বিনিময়ে আমাদের বাস করার জন্যে একটা রিজার্ভ অঞ্চল দেবে যেখানে আমরা আরামে থাকব। আমরা তোমাদের কথা বিবেচনা করে দেখব। কিন্তু এটা এত সহজ নয়। এই ভূমি আমাদের কাছে পবিত্র। যদি আমরা এই ভূমি তোমাদের দিয়ে দিই তাহলে তোমাদের মনে রাখতে হবে যে এই ভূমি পবিত্র। তোমরা তোমাদের ছেলেমেয়েদেরও নিশ্চিত করে শেখাবে এর পবিত্রতার কথা। তাদের শিখিও যে এখানকার হ্রদগুলোর পরিষ্কার জলের মধ্যে দেখতে পাওয়া যে কোন রহস্যময় ছায়াই আমাদের মানুষদের জীবনের কোন না কোন ঘটনার স্মৃতি। ঝরণাগুলোর জলের মর্মরে আমার বাবার ও তার পিতৃপুরুষদের স্বর শোনা যায়।

নদীরা আমাদের ভাই, তারা আমাদের তৃষ্ণা মেটায়। নদীরা আমাদের ক্যানো (নৌকা) বয়ে নিয়ে যায়, আমাদের ছেলেমেয়েদের মুখে খাবার যোগায়। যদি আমরা আমাদের দেশ তোমাদের দিই তাহলে তোমরা মনে রেখো, তোমাদের ছেলেমেয়েদের শিখিও যে নদীরা মানুষের ভাই সুতরাং তোমরা নদীদের সে রকমই যতœ করো, যেমন তোমরা তোমাদের ভাইদের করো। আমরা জানি সাদা মানুষেরা আমাদের ধরনধারণ বোঝে না। তার কাছে পৃথিবীর এক অংশের সঙ্গে অন্য অংশের কোন তফাৎ নেই। কেননা সে ভিনদেশী রাত্রির অন্ধকারে আসে, নিজের যা দরকার মাটির কাছ থেকে কেড়েকুড়ে নিয়ে চলে যায়। এই ধরিত্রী তার আত্মীয় নয়, তার শত্রু। সে একে জয় করে, তারপর ফেলে দিয়ে যায়। সে পিছনে ফেলে দিয়ে যায় তার নিজের পিতার কবর, কিছুই মনে করে না। নিজের সন্তানদের কাছ থেকে পৃথিবীকে সে চুরি করে, কিছুই তার মনে হয়না। শাদা মানুষদের শহরে কোথাও শান্ত নিরিবিলি জায়গা নেই যেখানে বসে বসন্তকালে পাতার কুঁড়িগুলোর খুলে যাওয়ার শব্দ শোনা যায়। অবশ্য হয়তো আমরা জংলী বলেই আমাদের এ রকম মনে হয়। জীবনের কী মূল্য আছে একজন লোক যদি জলের ঘূর্ণির মধ্যে আপন মনে একাকী গুনগুন করার শব্দ শুনতে না পায়? আমি একটা লাল মানুষ, আমি তোমাদের শহরের কিছু বুঝতে পারি না।

আমরা, লাল লোকেরা ছোট পুকুরের জল ছুঁয়ে বয়ে যাওয়া বাতাসের হালকা শব্দ শুনতে ভালোবাসি, ভালোবাসি দুপুরের বৃষ্টিতে ধুয়ে পরিষ্কার হয়ে যাওয়া বাতাসের নিজস্ব গন্ধ, পাইন বনের গন্ধ। আমরা তোমাদের দিয়ে যাব আমাদের জমি, আমাদের বাতাস। মনে রেখো, এই বাতাস, এই জমি আমাদের কাছে মূল্যবান, কেননা জন্তু গাছ মানুষ সবার নিশ্বাস এই একই বাতাসের মধ্যে ধরা আছে। যে বাতাস আমাদের পূর্ব-পুরুষের বুকে তার প্রথম বাতাসটি দিয়েছিল, সেই তার শেষ নিঃশ্বাসটিকে ধরে রেখেছে। তোমরা তোমাদের সন্তানদের শিখিও যে তাদের পায়ের তলায় যে মাটি, তাতে আছে তাদের পিতৃপুরুষের দেহাবশেষ, তাই মাটিকে যেন তারা শ্রদ্ধা করে। তোমাদের সন্তানকে শিখিও এই মাটিতে আছে তাদের পূর্বজদের ছাই। আমাদের স্বজনদের প্রাণ মাটিতে মিশে একে সমৃদ্ধ করেছে। একথা আমরা জানি যে পৃথিবী মানুষের সম্পত্তি। মানুষই পৃথিবীর। আমরা একথা জানি। প্রতিটি জিনিসই একে অন্যের সাথে বাঁধা যেমন রক্তের সম্পর্কে একটা পরিবারের লোকদের বেঁধে রাখে। সবকিছুই একে অন্যের সাথে বাঁধা। এই পৃথিবীর যা হবে পৃথিবীর সন্তানদেরও তাই হবে। জীবনের এই ছড়ানো জাল, মানুষ একে বোনেনি সে কেবল একটা সুতো মাত্র। এই জালটিকে সে যা করবে তার নিজেরও হবে ঠিক তাই। এমনকি শাদা লোকেরা, যাদের ঈশ্বর বন্ধুর মত তাদের সাথে চলাফেরা করেন, কথা বলেন, তারাও সকলে এই সাধারণ নিয়তির বাইরে নয়। শেষ অবধি হয়ত দেখা যাবে যে আমরা সকলেই একে অন্যের ভাই। যে কথা আমি জানি, হয়ত একদিন সে কথা সাদারা বুঝতে পারবে যে আমাদের ঈশ্বর আসলে একই।”

সিয়াটলের রেড ইন্ডিয়ান সরদার এক শতাব্দী আগে পরিবেশের সাথে মানব সভ্যতার যে সম্পর্ক উপলব্ধি করেছিলেন আমরা আজকের যুগের বস্তুবাদী সভ্যতাগর্ভী আধুনিক মানুষরা কি তা উপলব্ধি করতে পারছি? অবশ্যই পারছি না। যদি পারতাম তাহলে আমাদের বুড়িগঙ্গা নর্দমায় পরিণত হতো না, শীতলক্ষ্যা হতো না কেমিক্যালের বিষে নীল, তুরাগ আর বালু নদীর বুকে গড়ে উঠতো না আকাশ ছোঁয়া অট্টালিকা। তিতাস হতো না একটি মরা নদীর নাম, আন্তর্জাতিক সম্পত্তি গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্রের উজানে ৫৪ টি বাঁধ দিয়ে কোন আগ্রাসি শক্তি মানুষ আর জীববৈচিত্র্যের ঘাতকে পরিণত হতো না। নৌপথ বানিয়ে নষ্ট করা হতো তা বিশ্ব জীবনবৈচিত্র্যের মূল্যবান সম্পদ সুন্দরবন।

এবারের পরিবেশ দিবসের মূল প্রতিপাদ্য, “বন্য প্রাণি ও পরিবেশ, বাচাঁয় প্রকৃতি বাচাঁয় দেশ”। আসুন আমরা আমাদের নিজেদের প্রয়োজনেই বন্য প্রাণি ও পরিবেশ রক্ষায় সচেতন হই। আমাদের বুঝতে হবে ব্যক্তি স্বার্থ ও নিজ লাভটাকে সবার ওপরে স্থান দিয়ে আগ্রাসি জীবনযাপন করলে পরিবেশ বাঁচবে না। পরিবেশ না বাঁচলে পৃথিবী বাঁচবে না। পৃথিবী না বাঁচলে আমরা কেউ বাঁচবো না। হারিয়ে যাবে আমাদের আগামী প্রজন্ম। হারিয়ে যাবে মানবসভ্যতা। আর এজন্যই আমাদের সবার দায়িত্ব পরিবেশবান্ধব জীবন যাপন করে মানবসভ্যতাকে টিকিয়ে রাখা।

লেখকঃ উর্ধ্বতন যোগাযোগ কর্মকর্তা, ব্রি, গাজীপুর।
[email protected]


ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন :

টি মন্তব্য
মন্তব্যে প্রকাশিত যেকোন কথা মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। DeshReport.com-এর সম্পাদকীয় অবস্থানের সঙ্গে এসব অভিমতের কোন মিল নেই। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নিবে না

আরো সংবাদ...

মন্তব্য করুন