মুক্তমত

মোহাম্মদ আলী গ্রেট নন

প্রভাষ আমিন
৩ জুন সন্ধ্যায় হোটেল সোনারগাঁওয়ের বলরুমে বসেছিল প্রথম আলো ক্রীড়া পুরস্কারের আয়োজন। এমনিতে এখন নানা ব্যস্ততায় এ ধরনের আয়োজনে যাওয়া হয় না। কিন্তু ছেলে প্রসূনের জন্য গেলাম। সে অনুষ্ঠানে মঞ্চে ডাকা হয় বাংলাদেশের মোহাম্মদ আলী হিসেবে পরিচিত আব্দুল হালিমকে। তিনি মঞ্চে অরিজিনাল মোহাম্মদ আলীর বাংলাদেশ সফর নিয়ে স্মৃতিচারণ করছিলেন। কথা ছিল সফরের সময় মোহাম্মদ আলী বাংলাদেশের সেরা বক্সার আব্দুল আলিমের সঙ্গে রিঙে নামবেন। কিন্তু মোহাম্মদ আলী জানিয়ে দেন, তিনি যেহেতু পেশাদার কোনো ম্যাচ খেলবেন না, তাই পেশাদার কারো সাথে রিঙে নামতে চান না। বরং ছোট কারো সাথে খেলবেন। পরে সবার অনুরোধে মোহাম্মদ আলীর সাথে ছবি তুলতে যান আব্দুল হালিম। অনুমতি চেয়ে কাছে যেতেই মোহাম্মদ আলী হাত দিয়ে ফটোগ্রাফারদের থামার ভঙ্গি করেন। মন খারাপ হয়ে যায় আব্দুল হালিমের, একটু অপমানও বোধ করেন। কিন্তু বিশালদেহী মোহাম্মদ আলী আব্দুল হালিমকে কাছে টেনে নিয়ে মুখ বরারব ঘুষির ভঙ্গি করে ক্যামেরাম্যানদের ইশারা দেন, এবার ছবি তোল। এই হলো মোহাম্মদ আলী। শুক্রবার রাতে এই স্মৃতিচারণ শুনে শনিবার সকালে ঘুম ভাঙলো মোহাম্মদ আলীর হাসপাতালে ভর্তির খবর দিয়ে, তারপর লাইফ সাপোর্ট, তারপর আর নেই। সব শুন্য হয়ে যায়।

বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা ফুটবল, জনপ্রিয়তার নিরিখে মুষ্টিযুদ্ধ অনেক পেছনে। ব্যক্তিগতভাবে মারামারিকেন্দ্রিক এই খেলাটি আমার একদম পছন্দ নয়। কিন্তু শুধু আমার নয়, আমাদের সময়ের সবচেয়ে প্রভাবশালী স্পোর্টস আইকনের নাম মোহাম্মদ আলী। আসলে শুধু আমাদের সময়ের নয়, সকল সময়ের। গত শতাব্দীর শেষ দিকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে শতাব্দী সেরা বাছাই করা হয়। অবধারিতভাবে মোহাম্মদ আলী গত শতাব্দীর সেরা হয়েছেন। কিন্তু এটা খুব ভুল জরিপ। মোহাম্মদ আলী শুধু শতাব্দী সেরা নন, তিনি আসলে এখন পর্যন্ত এ বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী স্পোর্টস আইকন। আলী আসলে নিজেকে মুষ্টিযুদ্ধ, দেশ, কাল সবকিছুর ঊর্ধ্বে তুলে নিয়েছেন। কেন? এই ছোট্ট প্রশ্নের উত্তর দেয়া খুব কঠিন। উত্তরটা আমার হৃদয় যতটা জানে, মস্তিষ্ক ততটা নয়।

মোহাম্মদ আলী একজন সফল যোদ্ধাও। ৬১টি লড়াইয়ের ৫৬টিতেই জিতেছেন। কিন্তু তাকে কখনো সাফল্য বা পরিসংখ্যান দিয়ে বিবেচনা করা হয় না। তার জেতা ম্যাচের সংখ্যা যদি আরো অনেক কম হতো, তাও তার প্রভাব একটুও কমতো না। তিনি শ্রেষ্ঠ, কারণ তিনি সবসময় মানবতার গান গেয়েছেন, মানবতাকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছেন। মোহাম্মদ আলী সবসময়ই প্রতিবাদী। তাকে ভিয়েতনামে যুদ্ধে যেতে বাধ্য করার চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু তিনি যাননি, প্রতিবাদ করেছেন। কারণ তিনি বিশ্বাস করেছিলেন, ভিয়েতনামে তার কোনো শত্রু নেই, কেন তিনি তাদের মারতে যাবেন। তাতে তিনি খেতাব খুইয়েছেন, অনেক হেনস্থা হয়েছেন। কিন্তু মাথা নোয়াননি।

ষাটের দশক, সত্তরের দশকের অন্ধকার সময়ে কালো মানুষের অধিকার আদায়ে অনুপ্রেরণার উৎস ছিলেন আলী। তার দম্ভ কালো মানুষ নয়, মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের পতাকাই ঊর্ধ্বে তুলে ধরে। নিছক ঘুষাঘুষির মত একটি খেলাকে কিভাবে শিল্পের পর্যায়ে উন্নীত করতে হয়, মোহাম্মদ আলী তা দেখিয়ে দিয়েছেন। আলী বক্সিং রিঙে প্রজাপতির মত উড়ে উড়ে মৌমাছির মত হুল ফোটাতেন। বক্সিং খেলাটি আসলে মোহাম্মদ আলীর সমার্থক হয়ে গেছে। চোখ বন্ধ করে বলুন তো আপনি কয়জন বক্সারকে চেনেন বা কয়জনের নাম জানেন। ফোরম্যান, ফ্রেজিয়ার, লিস্টন, স্পিংকস- যে কয়জন বক্সারের নাম আপনার মনে আসবে সবাই কিন্তু মোহাম্মদ আলীর প্রতিপক্ষ হিসেবে ইতিহাসে খ্যাত। সাম্প্রতিক মাইক টাইসনের যতটা না খ্যাতি তারচেয়ে বেশি কুখ্যাতি। স্পোর্টসম্যানরা সবসময় জনপ্রিয় হন, মানুষ তাদের অনুসরণ করে। কিন্তু সবাই অনুকরণীয় নয়। ডিয়েগো ম্যারাডোনা গ্রেট ফুটবলার, কিন্তু স্পোর্টস আইডল নন। কেউই চাইবেন না তার সন্তান ম্যারাডোনার মত হোক। তবে মোহাম্মদ আলী সবার জন্যই অনুকরণীয়। পেলে গ্রেট, ব্রাডম্যান গ্রেট, শচিন গ্রেট, উসাইন বোল্ট গ্রেট। কিন্তু মোহাম্মদ আলী দ্যা গ্রেটেস্ট।

হাতের মত মুখও চলতো আলীর। কথায় ঘায়েল করে দিতেন প্রতিপক্ষকে। তার কথার মধ্যে অহঙ্কার, দম্ভ থাকতো। কিন্তু তার মধ্যেও লুকিয়ে থাকতো সৌন্দর্য্য, ঠিকড়ে বেরুতো আত্মবিশ্বাস। নইলে ‘আমাকে হারানোর স্বপ্ন দেখছ? তোমার উচিত এক্ষুনি ঘুম থেকে ওঠা এবং আমার কাছে ক্ষমা চাওয়া।‘, ‘ দুটি জিনিস আছে, যেগুলোকে আঘাত করা কিংবা দেখা যায় না- ভূত আর মোহাম্মদ আলী’ বলা সহজ নয়। তবে তার মধ্যে লুকিয়ে ছিল দার্শনিক সত্বাও। আজ পাঠকের জন্য তার তেমন একটি উক্তি ‘অসম্ভব শব্দটির মধ্যেই সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে, অসম্ভব তা শুধু ক্ষণিকের। কোনো কিছুই অসম্ভব নয়। অসম্ভব অসম্ভব’।

১৯৭৮ সালে মোহাম্মদ আলীর বাংলাদেশ সফরের সময় আমি গ্রামে ছিলাম। টিভিতে দেখেছি তাকে। তবে এই গ্রেটেস্টের সাথে একই শহরে কয়েকদিন ছিলাম। ২০১১ সালে আমি মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের আমন্ত্রণে সে দেশ সফরে গিয়েছিলাম। সফরে আমরা তিনদিন ছিলাম অ্যারিজোনার রাজ্যের ফিনিক্সে। তিনদির পর আমাদের মন্টানা যাওয়ার সময় হলো, তখন আমাদের গাইড বললেন, তোমরা কি আালীকে চেনো?
: কোন আলী?
: বক্সার মোহাম্মদ আলী।
আমি তো চমকে গেলাম, কেন? কী হয়েছে?
গাইড হাসতে হাসতে বললেন, তিনি তো ফিনিক্সেই থাকেন। শুনে খুব রাগ হলো তার ওপর। আগে জানলে অন্তত আলীর বাড়ির সামনে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতাম। তবু দেখা না হলেও দ্য গ্রেটেস্টের সাথে এক শহরে তিনদিন ছিলাম, সেটাই অনেক থ্রিলিং ছিল। সেই ফিনিক্সের একটি হাসপাতালেই মারা গেছেন আলী।

শুরুতেই মোহাম্মদ আলীর বাংলাদেশ সফরের কথা লিখেছি। ১৯৭৮ সালের ১৮ থেকে ২২ ফেব্রয়ারি পাঁচদিনের সফরে বাংলাদেশের হৃদয় জয় করেছিলেন মোহাম্মদ আলী। তবে তার আগে থেকেই বাংলাদেশের মানুষের নয়নের মনি ছিলেন এই বক্সার। মনে আছে সত্তরের দশকে মোহাম্মদ আলীর লড়াই কী উন্মাদনার সৃষ্টি করতো গ্রামে-গঞ্জে। আমরা কয়েক মাইল দূরে গিয়ে টিভি দেখতাম। আমাদের বাড়িতে তো দূরের কথা, আমাদের গ্রামেই কোনো টিভি ছিল না। তখন একমাত্র টেলিভিশন চ্যানেল বিটিভি। তালিবাবাদ ভূ-উপগ্রহের মাধ্যমে বিটিভি নানা আন্তর্জাতিক ইভেন্ট সরাসরি সম্প্রচার করতো। একটিমাত্র টিভি চ্যানেল হলেও মোহাম্মদ আলীর লড়াই নিয়ে যে উন্মাদনা সৃষ্টি হতো, তা বাংলাদেশ-ভারতের ক্রিকেট ম্যাচ বা ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ ম্যাচের সাথে তুলনা করলে এখনকার প্রজন্ম কিছুটা ধারণা করতে পারবে। পাঁচদিনের বাংলাদেশ সফরে মোহাম্মদ আলী সিলেট গেছেন, কক্সবাজার গেছেন, চট্টগ্রাম গেছেন। নৌকায় ঘুরেছেন। দেখেছেন বাংলার সৌন্দর্য্য।

শুরুতে যে লড়াইয়ের কথা বলা হয়েছে। তিনি লড়েছিলেন গিয়াসউদ্দিন নামে এক কিশোরের সাথে। এবং ভাণ করেছিলেন নকআউট হয়ে গেছেন। সে সফরে তাকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব দেয়া হয়েছিল। তার হাতে তুলে দেয়া হয়েছিল সবুজ পাসপোর্ট। কক্সবাজার একখণ্ড জমিও দেয়া হয়েছিল আলীকে। সে ভালোবাসায় আপ্লুত ছিলেন আলী। লাসভেগাসে স্পিংকসের কাছে হেরে যাওয়ার মাত্র তিনদিন পর বাংলাদেশে এসেছিলেন আলী। বাংলাদেশ থেকে যাওয়া্র সময় বিদায়ী সংবাদ সম্মেলনে তিনি বাংলাদেশকে কথা দিয়েছিলেন স্পিংকসকে হারিয়ে তিনি প্রতিশোধ নেবেন। সংবাদ সম্মেলনে তিনি স্পিংকসের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, ‘স্পিংকস তুমি যার সাথে লড়তে এসেছ, সে আগের চেয়ে আরও শক্তিশালী। সে একসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের নাগরিক।’ আলী কথা রেখেছিলেন। বিদায়ের সময় বিমানের দরজায় দাঁড়িয়ে মোহাম্মদ আলী বলেছিলেন ‘আই লাভ ইউ বাংলাদেশ, আই লাভ ইউ বাংলাদেশ, আই লাভ অল অফ ইউ টু’।

ফিরে গিয়েও বাংলাদেশকে ভুলে যাননি, বলেছিলেন ‘স্বর্গ যদি দেখতে চাও, বাংলাদেশে যাও তবে’। এমন মহান মানুষের এমন বিদায়ক্ষণে আমরা প্রাণ খুলে বলতে পারি ‘উই লাভ ইউ টু’।


ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন :

টি মন্তব্য
মন্তব্যে প্রকাশিত যেকোন কথা মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। DeshReport.com-এর সম্পাদকীয় অবস্থানের সঙ্গে এসব অভিমতের কোন মিল নেই। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নিবে না

আরো সংবাদ...

মন্তব্য করুন