মুক্তমত

কোরবানির সময় নানা ভাবনা

আবুল মোমেন  | কোরবানির ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় তাৎপর্য সকলেই জানেন।  স্রষ্টার উদ্দেশ্যে প্রিয় কিছু উৎসর্গ করতে হবে- এক্ষেত্রে তা হতে হবে কোনো নির্দিষ্ট প্রাণি, যেটির মাংস ভোজ্যও বটে। এর একদিকে ত্যাগ আর অন্যদিকে যারা সংবৎসর তেমন খেতে পায় না তাদের নিয়ে খাওয়ার তৃপ্তিটুকু থাকার কথা। উভয় কাজেই পুণ্য লাভ হবে।

কিন্তু এখন কোরবানি নেহায়েৎ বড়লোকদের খাওয়া-দাওয়ার প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছে। এককালে সব সচ্ছল পরিবারেই গবাদি পশু-পালনের রেওয়াজ ছিল। সেখান থেকে একটি পশু এদিন কোরবানি দেওয়াই ছিল নিয়ম। বাড়ির পোষা প্রাণিটি সবারই পরিচিত ও প্রিয়ও হত বটে। এখন কোরবানির হাট থেকেই পশু কেনা হয়। তারও চেয়ে দুর্ভাগ্য হল, গরীবদের মধ্যে মাংস বিলিয়ে দেওয়া বা তাদের নিয়েই কোরবানির মাংস খাওয়ার রেওয়াজ প্রায় উঠে গেছে।

কোরবানি এখন গরু-ছাগল খামারিদের জন্যে বছরব্যাপী বিনিয়োগ। এর সাথে যুক্ত হয়েছে হাটের ইজারাদার, পশু পরিবহন, বেচা-কেনার দালালি, পশু খাদ্যের ব্যবসা, পশু চিকিৎসার পেশা, কসাইয়ের ভূমিকা। তারপর এসে যায় চামড়ার ফড়িয়া, ক্রেতা, মওজুদদার, আড়তদার, চামড়া শিল্পের মালিকের তৎপরতা।

আজকাল মানুষের ক্রয় ক্ষমতা বেড়েছে। ফলে কোরবানিদাতার সংখ্যাও বেড়েছে। পঞ্চাশ-ষাট বছর আগে শহরে অনেক বাড়িতে কোরবানি হলেও গ্রামে অল্প কিছু নির্দিষ্ট বাড়িতেই কোরবানি হত। অধিকাংশের সামর্থ্য ছিল না। গত বছর গরু-ছাগল মিলিয়ে প্রায় এক লক্ষ পশু কোরবানি হয়েছিল। এ বছর নিশ্চয় এ সংখ্যা বাড়বে। আগে এ উপলক্ষ্যে ভারত থেকে প্রচুর গরু বৈধ-অবৈধ পথে আসত। গত কয়েক বছর ধরে ভারতের গরু রফতানির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক-সামাজিক আন্দোলনের ফলে বৈধ পথে গরু আসা বন্ধ হয়ে গেছে – যদিও ভারত বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম গো-মাংস রপ্তানিকারক দেশ। আস্ত জ্যান্ত গরু রফতানিতে বাধা আসায় দেশে এ খাতে বিনিয়োগ বেড়েছে। গত দু’তিন বছরেই খাতটির পরিসর বেড়ে গেছে। এ বছর খামারি এবং পশুপালন দপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন দেশে খামারে লালিত পালিত গরু ও ছাগল দিয়েই চাহিদা সামাল দেওয়া যাবে। অর্থাৎ চাল, সবজি ও মাছের পরে বাংলাদেশ গবাদিপশুতেও স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে উঠছে।

ফলে কোরবানিকে উপলক্ষ করে দেশে গবাদি পশুর খামার একটি শিল্প খাত হিসেবে রীতিমত প্রতিষ্ঠিত হয়ে উঠছে। একে ঘিরে পশু খাদ্য ও পশুচিকিৎসার খাত দুটি চাঙ্গা হয়ে উঠছে। চাহিদা বাড়ছে মশলা, তেল, পেঁয়াজ-রসুন, এমনকি এ সময়ে ডিপ ফ্রিজের বাজারও বেশ চাঙ্গা হয়ে ওঠে।

কোরবানির উৎস হাজার বছর আগেকার যে ঘটনা এবং এর অন্তর্নিহিত যে তাৎপর্য তা কারো মনে থাকে কিনা সেটা গভীরভাবে চিন্তার বিষয়। কারণ দিনে দিনে এটি একটি ভোজ উৎসবে পরিণত হচ্ছে। এ সময় ছুটি থাকে, কোনো কোনো বছর  যেমন এ বছর  সাপ্তাহিক ছুটির সাথে মিলে বেশ দীর্ঘ হয় ছুটি। সরকার রোববার ছুটি ঘোষণা করায় কার্যত ১৫ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার একদিন ছুটি নিতে পারলে টানা ছুটি হবে ৯দিন ৯ তারিখ শুক্রবার থেকে ১৭ তারিখ শনিবার পর্যন্ত।

লম্বা ছুটিতে বেড়ানোর প্রশ্ন ওঠে, তাতে দেশের পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে ব্যবসায়ের ছোঁয়া লাগে। সামর্থ্য যাদের ভালো তারা দেশের বাইরেও চলে যান। নতুন পোশাক আগে সাধারণত কেবল রোজার ঈদে কেনা হত, আজকাল উৎসবের পরিসর বড় হওয়ায় অনেকেই এ ঈদেও ছেলেমেয়েদের নতুন জামার বায়না মেটান। ছুটির দিনগুলোতে বিনোদনের দায়িত্ব নিচ্ছে বিভিন্ন টিভি চ্যানেল। তারাও কয়েক মাস ধরে খেটে নাটক বানাচ্ছে, অন্যান্য বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান চালাচ্ছে। এতেও যুক্ত হাজার কয়েক মানুষ। সব মিলিয়ে কোরবানিকে ঘিরে কত হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হবে তা নিশ্চয় অর্থনীতিবিদরা যথাসময়ে আমাদের জানাবেন।

কোরবানি আদতে হজ্বেই অনেক অনুষ্ঠানের একটি। কিন্তু আরব থেকে বহু দূরে অবস্থিত এদেশে হজ্ব এখন অতি ব্যয়সাধ্য কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এককালে মানুষ দেশ থেকে দীর্ঘ ট্রেন যাত্রা করে বোম্বে যেতেন, সেখান থেকে জাহাজে চেপে পৌঁছতেন এডেন, সেখান থেকে উটের কাফেলায় যেতেন মক্কা। সেকালের জন্যে সেটাও ছিল ব্যয়সাধ্য কাজ, তারও চেয়ে বড় কথা শারীরিক সামর্থ্যও প্রয়োজন ছিল। কিছুদিন আগেও জাহাজে করে হজ্বে যাওয়া যেত। কিন্তু সেটাও বেশ অনেক বছর হল বন্ধ হয়ে গেছে। এখন কেবলমাত্র বিমানেই হজ্বে যাওয়া যায়। এতে মাথাপিছু তিন লক্ষাধিক টাকার প্রয়োজন হয়। বিমানে আসন সীমিত, মানুষের সাধ্যও সীমিত। তা সত্ত্বেও আগ্রহী সকলেই যে যেতে পারছেন তা নয়। হজ্বযাত্রা নিয়েও বিরাট ব্যবসা গড়ে উঠেছে। হজ্ব এজেন্ট বা এজেন্সি সরকারের কাছ থেকে লাইসেন্স নিয়ে এ ব্যবসা করছে। তার মধ্যে দক্ষতার তারতম্যও আছে, মানসিকতার তারতম্যও থাকে, ফলে অনেকে ঠকছেন। কেউ কেউ ন্যায্য টাকা দিয়েও যথোচিত সেবা পাচ্ছেন না। অভিযোগ উঠছে দুর্নীতি ও অদক্ষতার।

এসব কর্মকাণ্ড ও এই ব্যবসাকে ঘিরে আরও ব্যাপকভাবে ব্যবসায়ের, কাজের, উপার্জনের যেসব সুযোগ তৈরি হয়েছে তা এত ব্যাপক ও বিশাল যে এ কেবল একটি সম্প্রদায়ের মধ্যে আর সীমাবদ্ধ নেই। নানা ধর্মের নানা জন এতে যুক্ত হচ্ছেন নানাভাবে কেউ বিমান চালিয়ে সেবা দিচ্ছেন নিজেও উপার্জন করছেন, কেউ পশুখাদ্য সরবরাহের ব্যবসা করছেন, কেউবা বিনোদনের নাট্যে অভিনয় করে ভূমিকা রাখছেন। কসাই থেকে ডিজাইনার কত পেশার মানুষ এতে যুক্ত আছেন। এ এক সর্বজনীন রূপ ধারণ করেছে। এতে ব্যবসা, পেশা, উপার্জনের দিকটা বেশ স্পষ্ট। দেশের অর্থনীতি চাঙ্গা থাকলে এ নিয়ে উদ্বেগ নেই।

কিন্তু মানুষ কেবল এসব বাহ্য বিষয় নিয়েই উদয়াস্ত ব্যস্ত ও মশগুল থাকলে কারো না কারো মনে প্রশ্ন উদয় হবে। অর্থাৎ আসল কাজের খবর কী? আমাদের মনের ভোগের ইচ্ছা দিনে দিনে যতটা প্রকটভাবে ধরা পড়ছে, বিশেষত বিভিন্ন উৎসবকে কেন্দ্র করে প্রকাশ হয়ে পড়ে, তার পাশাপাশি ত্যাগের মনোভাব কি ছিটেফোঁটাও দেখা যায়? ত্যাগের মহিমা যেমন সমাজ ভুলতে বসেছে তেমনি ভোগের স্থূল আতিশয্যে উপভোগের আনন্দে মেতে উঠতেও পারছে না।

ত্যাগ বা ত্যাগের মনোভাব হারিয়ে গেলে আমরা যে নিজ ধর্ম এবং মনুষ্য ধর্মও হারাতে থাকি? বিষয়টা নিয়ে আমরা কি ভাবব না?

লেখক : কবি, সাংবাদিক ও সমাজচিন্তক


ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন :

টি মন্তব্য
মন্তব্যে প্রকাশিত যেকোন কথা মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। DeshReport.com-এর সম্পাদকীয় অবস্থানের সঙ্গে এসব অভিমতের কোন মিল নেই। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নিবে না

আরো সংবাদ...

মন্তব্য করুন