মুক্তমতলাইফষ্টাইল

জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি যেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব”

মৌ_চক্রবর্তী : গল্পটা আমার এক বন্ধুর কাছে শোনা। সঙ্গত কারনেই তার নাম উল্লেখ করছি না। এক গ্রামে গিয়ে নারী নির্যাতন বিষয়ে কিছু মহিলার সাথে কথা বলেছিল সে। তো এক মহিলাকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, ” নারী নির্যাতন বলতে আপনি কি বোঝেন?” উত্তরে সে বলেছিল, ” স্বামী মাসে ২০-২৫ দিন মারলে ওইটা নারী নির্যাতন ” অবাক হয়ে আমার সেই বন্দু প্রশ্ন করেছিল, ” আর যদি ১০-১৫ দিন মারে?” উত্তরে মহিলা মহা বিরক্ত হয়ে বলে, ” ধুর, ওইটা কোন ব্যপার নাকি? স্বামী মারতেই পারে!” শুনে হেসেছিলাম। হাসা ছাড়া আর কিই বা করার থাকে? সে মহিলা নাহয় এক অজ পাড়া গায়ের মেয়ে। আমরা শহুরে শিক্ষত মানুষরা নারী নির্যাতন বলতে কি বুঝি? বেশিরভাগ মানুষ এটাও জানে না যে, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও যদি নারীকে পুরুষের সমান গুরুত্ব দেয়া না হয় তাহলে তাকেও পারিবারিকভাবে নারী নির্যাতনের আওতায় ধরা হয়। ইভটিজিং থেকে শুরু করে রাস্তাঘাটে প্রতিনিয়ত মেয়েদের এমন অবস্থার মুখোমুখি হতে হয় যে কেউ রেপড হয়ে খুন না হওয়া পর্যন্ত তাকে নারী নির্যতন হিসেবে কেউ ধরবেই না। অবশ্য ধর্ষিত হয়ে মরার পরও যে মেয়েটা সহানুভূতি ( বিচারের কথা বলে আর লোক হাসাতে চাই না) পাবে তার নিশ্চয়তা কে দিচ্ছে? মেয়েটার ড্রেস কেমন ছিল, চলাফেরা কেমন ছিল, ছেলে বন্ধু কেন ছিল ব্লা ব্লা ব্লা প্রশ্নে ধর্ষণটাও হয়ে যাবে জাস্টিফাইড। এইতো সেদিনের ঘটনা। তানজিম নাঈমা নামের এক আপুর ফসবুক স্ট্যাটাস, যেটা ভাইরাল হয়ে হয়তো আমার মত অনেকেরই হোমপেজে এসেছে। তিনি একটুর জন্যে গ্যাং রেপড হওয়া থেকে বেঁচে গেছেন । তিনি প্রতিদিন মিরপুর ১০ থেকে বনানীতে টিউশনি করতে যান । যথারীতি ঐ দিন ও তিনি টিউশনি শেষে বাসায় ফিরছিলেন । সৌনিক ক্লাবের সামনে এসে বাস থেকে নামার পর তিনি হাঁটতে শুরু করলেন । হঠাতই তিনি ফিল করলেন কেউ একজন হয়তো তাঁর পিছনে থাপ্পড় দিলো । যতক্ষনে তিনি পিছন ফিরে তাকালেন ততক্ষনে লোকটা দৌড়াতে শুরু করলো । তিনিও লোকটার পিছন পিছন দৌড়াতে শুরু করলেন । কিছুক্ষণ পর তাঁর চিত্কারে ৮-১০লোক এসে ওভারব্রিজের উপরে লোকটাকে ধরে দিল । আপু তখন বললেন যে লোকটা আমার গায়ে হাত দিয়েছে । তা শুনে লোকগুলোর রিপ্লাইটা ছিলো এরকম , “ওহ , গায়ে হাত দিছে ? মোবাইল নেয় নাই ? আমরা তো ভাবছি মোবাইল টান দিছে তাই ধরছি ।” তাদের কথা শুনে মনে হলো যেন মেয়েদের গায়ে হাত দেয়াটা তেমন অস্বভাবিক কিছুই না ! তখন তিনি অন্যউপায় না দেখে , নিজেকে বাঁচাতে pepper spray করে দিলেন লোকটার চোখে । কিনতু আশ্চর্যের ব্যাপার হলেও সত্যি যে ঠিক তখনই তিনি ভিকটিম থেকে হয়ে গেলেন মলম পার্টি ! তারপর ঐ লোকগুলোর সাথে আরো কিছু লোক মিলে গেলো ,হবে প্রায় ২০-৩০জনের মতো । আর তারা তখন তাদের ভাবনায় যে পুরুষত্বের বাস , সেটার প্রতিফলন দেখালো । উনার এই লেখার কমেন্টে বেশিরভাগ মানুষ খুব পজিটিভলি উনাকে সাপোর্ট করলেও তা কিন্তু বাস্তবতাকে রিফ্লেক্ট করে না। করলে এমন ঘটনা আদৌ ঘটত? হয়ত এমন দেখা যাবে যে ফেসবুকে বড় বড় বুলি কপচানো লোকগুলোর মধ্যেই রয়েছে অনেক পটেনশিয়াল রেপিস্ট! কয়েক দিন আগেইতো আমীন জুয়েলার্সের মালিকের ছেলের “দুষ্টুমি” কে জাস্টিফাই করার জন্য সোস্যাল মিডিয়া বলতে গেলে দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠে তনুর অপরাধ তাহলে কি ছিল? আসলে অপরাধ ওদের কারোই ছিলো না ।অপরাধ হলো আমাদের মন মানসিকতার । একটা লোহার মাঝে জং ধরে গেলে ঐ লোহাটা তাঁর কার্যক্ষমতা হারিয়ে ফেলে ঠিক তেমনি একজন মানুষ যে মন মানসিকতার দিক থেকে বিকারগ্রস্থ তার দ্বারাও সমাজের কোনো শুভবুদ্ধির উদয় ঘটে না । সমাজটা এক দিনে পালটায় না। সমাজের আজকের এই রূপটাও এক দিনে আসেনি। আপনি আমি মুখে কুলুপ দিয়ে বসে ছিলাম বলেই আজ এই অবস্থা। এরপর হাতে পায়ে শিকল পড়ে গৃহবন্দী হয়ে থাকতে হবে যদি এখনো কিছু না বলি; যদি প্রতিবাদটা শুধু ফেসবুকেই সীমাবদ্ধ রাখি ।  

 

জেড/আর


ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন :

টি মন্তব্য
মন্তব্যে প্রকাশিত যেকোন কথা মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। DeshReport.com-এর সম্পাদকীয় অবস্থানের সঙ্গে এসব অভিমতের কোন মিল নেই। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নিবে না

আরো সংবাদ...

মন্তব্য করুন