বিনোদন

কীভাবে কাটছে দিলদারের পরিবার ?

বিনোদন ডেস্ক : একসময়ে ঢাকাই চলচ্চিত্রে দিলদার মানেই দম ফাটানো হাসি! বাংলাদেশে কৌতুক অভিনেতা হিসেবে এক চেটিয়া বাংলা সিনেমায় দাপুটে অভিনয় করে গেছেন যিনি, তিনি দিলদার। পর্দায় তার উপস্থিতি মানেই দম ফাটানো হাসির রোল। দর্শক পর্দায় তার অঙ্গভঙ্গি দেখে হেসে গড়াগড়ি খেতো। মুহূর্তে কাঁদিয়েও ফেলতে পারতেন এই জাত অভিনেতা। চরিত্রের এই বৈচিত্রময়তাও প্রবল ছিল এই গুণী অভিনেতার মধ্যে।

তিনি চলচ্চিত্র জগতে প্রবেশ করেন ১৯৭২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত কেন এমন হয় চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে। এরপর থেকে অসংখ্য সিনেমায় তার উপস্থিতি ঘটেছে। বিশেষ করে আশি ও নব্বইযের দশকের বাংলা সিনেমায় কৌতুক অভিনেতা মানেই দিলদার। অঘোষিতভাবে তিনি বাংলা কমেডির রাজপুত্র বনে গেয়েছিলেন।

কৌতুক অভিনেতা হিসেবে দিলদার জনপ্রিয়তার এমন উচ্চতায় পৌঁছে গিয়েছিলেন যে, তাকে নায়ক করে ‘আব্দুল্লাহ’ নামে একটি ছবিও নির্মাণ করা হয়। ওই ছবিতে একজন লোক হাসানো মানুষের খোলস ছেড়ে তিনি হাজির হয়েছিলেন অন্যরূপে। ছবিতে দর্শক তার অভিনয় দেখে যেমন মুগ্ধ হয়েছেন, তেমনি চরিত্রের বৈচিত্রও দেখিয়েছেন অভিনেতা দিলদার।

দিলদারের স্ত্রীর নাম রোকেয়া বেগম। এই দম্পতির দুই কন্যা সন্তান। বড় মেয়ের নাম মাসুমা আক্তার। পেশায় তিনি দাঁতের ডাক্তার। বিয়ে করেছেন অনেক আগেই। তার ছেলে নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়য়ে পড়ছে আর মেয়ে পড়ছে ক্লাস সেভেনে। দিলদারের ছোট মেয়ের নাম জিনিয়া আফরোজ। তিনি বর্তমানে বেকার, তার দুই সন্তান।  ছেলে ‘ও লেভেল’ এ পড়ছে এবং মেয়ে ক্লাস ফাইভে পড়ছে।

সেই প্রিয় মানুষ দিলদার নেই। এখনো তাকে ভালোবাসেন দর্শক। এখনো তার নামটি মজার মানুষদের পরিচয় হিসেবে উচ্চারিত। অনেকেই জানতে চান এই অভিনেতার পরিবার সম্পর্কে। কেমন আছে, কীভাবে কাটছে দিলদারের পরিবারের সদস্যদের জীবন। এইসব জানাতে আমাদের মুখোমুখি হয় এই অভিনেতার ছোট মেয়ে জিনিয়া, সন্ধ্যায় রাজধানীর নিকেতনের বাসায় দিলদারের কনিষ্ঠ কন্যা জিনিয়া আফরোজ আমাদের জানান তাদের পরিবারের অবস্থা।

তিনি বলেন, আব্বা মারা যাওয়ার পর আমাদের মাথার ওপর থেকে নির্ভরতার ছায়া সরে যায়। সানারপাড় আমাদের পারিবারিক কবরস্থানে বাবাকে দাফন করা হয়। আমি এখনো মাঝেমধ্যে গিয়ে কবর জিয়ারত করি।

জিনিয়া জানান, বাবা প্রথমে থিয়েটারে কাজ করতেন। এরপর চলচ্চিত্রে আসেন। তখন আমরা ‘গুলশান ২’ এলাকায় থাকতাম। পাঁচ শতাধিক চলচ্চিত্রে তিনি কাজ করেছেন। চলচিত্রে কাজ করে বাবা যে টাকা রোজগার করেছেন তার বেশীরভাগই বাবা গরীবদের মাঝে দান করেছেন। যা চলচিত্র সংশ্লিষ্ট সবাই জানে। এর মধ্যে থেকে আমার মা টাকা জমিয়ে সারুলিয়া (ডেমরা) তে একটা পাঁচতলা বাড়ি করেছেন যা দিয়ে আজ আমার মায়ের জীবন অতিবাহিত হচ্ছে।বাবার মৃত্যুর পর চলচ্চিত্রের মানুষদের সঙ্গে যোগাযোগ ছিন্ন হয় বলে জানান তার কন্যা জিনিয়া।

তিনি বলেন, ‘আব্বা মারা যাওয়ার পর আনিস আঙ্কেল এবং প্রয়াত নায়ক মান্না মাঝে মধ্যে তাদের খোজখবর নিতেন। কিন্তু এখন মিডিয়ার কারও সঙ্গে যোগাযোগ নেই।

জিনিয়া আরও বলেন, আব্বা বিএনপি’র রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। একসময়  জিসাস (জিয়া সাংস্কৃতিক সংসদ)’র সভাপতি ছিলেন। মারা যাওয়ার পর প্রথম তিন-চার বছর সংগঠনটি আব্বার মৃতুবার্ষিকী পালন করতো। আজকাল আর কেউ মনে রাখে না।’

এক ছেলে ও এক মেয়ের জননী দিলদারের ছোট মেয়ে জিনিয়া। ছেলেমেয়েদের দেখাশোনর পর আপাতত গুলশানের আশপাশে চাকরি খুঁজছেন।তিনি বলেন আমার স্বামী মারা গেছেন।  অফিস দূরে হলে আমার জন্য সমস্যা। কারণ ওদের দেখাশোনর সমস্যা হয়। ছেলে ‘ও লেভেল’ এ পড়ছে এবং মেয়ে ক্লাস ফাইভে পড়ছে। ওদের দেখাশোনার জন্য আমি দূরে অফিস নিতে পারছিনা।

জিনিয়া কষ্টের সহিত বলেন, কোথাও বাবার সিনেমা প্রচার হলে আমি দেখতে পারিনা, এত আদর তার কাছ থেকে পেয়েছি যে, তাকে ছাড়া পুরো জীবনটাই কেটে যাবে ভাবলেই মন কেঁদে ওঠে।আমাদের এখন যা কিছু আছে সবকিছু আমার মা দেখাশোনা করেন, ওনারও বয়স হয়েছে। আমাদের দুই বোনের আলাদা সংসার রয়েছে। এর মধ্যে যতটুকু পারি দুই বোন মায়ের দেখাশোনা করি।

বাবার স্মৃতি টেনে জিনিয়া বলেন, আমার মডেলিং করার শখ ছিল। কিন্তু আব্বা চাইতেন না আমি মিডিয়ার সঙ্গে যুক্ত হই। গিটার বাজানো শিখতে চেয়েছিলাম। আব্বা সেটাও দেননি, কারণ তিনি মনে করতেন লেখাপড়ায় ঘাটতি পড়বে। মিডিয়াতে কাজের নেশা চেপে বসবে।তিনি কখনও চান নাই আমরা কেউ মিডিয়াতে আসি।

তিনি আরও বলেন, আব্বা মারা যাবার পর একটা বিরাট পরিবর্তন টের পেয়েছি চারপাশে। তিনি বেঁচে থাকার সময় চারপাশের মানুষ আমাদের যেমন মূল্যয়ন করতেন, এখন আর সেভাবে করে না। আর আব্বা ছিলেন আমাদের মাথার ওপর বট গাছ। বাবার মুত্যুর পর, অনেক কষ্টে আম্মা আমাদের দু-বোনকে আগলে রেখেছেন । পত্রপত্রিকার মাধ্যমে জানলাম আব্বার মৃতুবার্ষিকীতে শিল্পী সমিতি দোয়া-মিলাদের আয়োজন করেছে। এ জন্য শিল্পী সমিতির কাছে কৃতজ্ঞতা জানাই।

আলাপের শেষের দিকে দিলদার কন্যা বলেন, আব্বার চলে যাওয়ায় তার অভাব শুধু আমরা নই, পুরো দেশের চলচ্চিত্র প্রিয় মানুষরা অনুভব করেন। এখনও তাকে দেশের মানুষ মনে রেখেছে এটাই তার সন্তান হিসেবে আমার কাছে শ্রেষ্ঠ পাওয়া । শুধু আমার বাবা নয়, সব শিল্পীদের ক্ষেত্রে এটা হওয়া উচিত।

তিনি বলেন, ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে জড়িত সকল শিল্পীদের জন্য একটা ফান্ড থাকা প্রয়োজন। একজন শিল্পী মারা যাওয়ার পর তার পরিবার এতে উপকৃত হবেন। পরিশেষে তিনি তার প্রয়াত বাবার জন্য সকলের কাছে দোয়া চেছেছেন।

দিলদারের উল্লেখযোগ্য সিনেমাগুলোর মধ্যে ‘বেদের মেয়ে জোসনা’, ‘অন্তরে অন্তরে’, ‘বিক্ষোভ’, ‘কন্যাদান’, ‘চাওয়া থেকে পাওয়া’, ‘জীবন সংসার’, ‘স্বপ্নের নায়ক’, ‘আনন্দ অশ্রু’, ‘শান্ত কেন মাস্তান’, ‘প্রিয়জন’, ‘বিচার হবে’ এবং ‘বীরপুরুষ’সহ অসংখ্য জনপ্রিয় চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি। ‘তুমি শুধু আমার’ নামের একটি চলচ্চিত্রের জন্য ২০০৩ সালে কৌতুক অভিনেতা হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারও অর্জন করেন তিনি।১৯৪৫ সালে চাঁদপুরে জন্ম নেয়া এই গুণী অভিনেতা মাত্র ৫৮ বছর বয়সে ২০০৩ সালের ১৩ জুলাই মৃত্যু বরণ করেন।

 

দেশ রিপোর্ট / আর


ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন :

টি মন্তব্য
মন্তব্যে প্রকাশিত যেকোন কথা মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। DeshReport.com-এর সম্পাদকীয় অবস্থানের সঙ্গে এসব অভিমতের কোন মিল নেই। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নিবে না

আরো সংবাদ...

মন্তব্য করুন