অর্থনীতিজাতীয়তথ্য প্রযুক্তিপ্রধান সংবাদ

ফোরজির তরঙ্গ নিলাম আজ

দেশে ফোরজি সেবা চালুর আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে গত মাসে। এরই অংশ হিসেবে সেলফোন অপারেটরদের প্রয়োজনীয় তরঙ্গ কেনার সুযোগ দিতে আজ সকালে ঢাকা ক্লাবে অনুষ্ঠিত হচ্ছে তরঙ্গ নিলাম। যৌথভাবে এ নিলাম আয়োজন করেছে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ এবং বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)।

কমিশন সূত্রে জানা গেছে, ৯০০, ১৮০০ ও ২১০০ মেগাহার্টজ— এ তিনটি ব্যান্ডের তরঙ্গের জন্য নিলাম অনুষ্ঠিত হবে। ৯০০ ও ১৮০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডের প্রতি মেগাহার্টজ তরঙ্গের ভিত্তিমূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ কোটি ডলার। আর ২১০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডের প্রতি মেগাহার্টজ তরঙ্গের ভিত্তিমূল্য ২ কোটি ৭০ লাখ ডলার। এবার ৯০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডে দুটি ব্লকে মোট ৩ দশমিক ৪ মেগাহার্টজ, ১৮০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডে চারটি ব্লকে মোট ১৮ মেগাহার্টজ ও ২১০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডে পাঁচটি ব্লকে মোট ২৫ মেগাহার্টজ তরঙ্গ নিলামে বিক্রি করছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা।

এ বিষয়ে বিটিআরসি চেয়ারম্যান ড. শাহজাহান মাহমুদ বলেন, দেশে সেলফোন সেবায় নতুন প্রযুক্তি নিয়ে আসার অংশ হিসেবে ফোরজি চালু করা হচ্ছে। এরই মধ্যে বিশ্বের অনেক দেশে এটি চালু করা হয়েছে। নিলামের মাধ্যমে সেলফোন অপারেটররা প্রয়োজনীয় তরঙ্গ কিনবে বলে আশা করছি।

জানা গেছে, এবারের নিলামে অংশ নিচ্ছে গ্রামীণফোন ও বাংলালিংক। গ্রামীণফোন একটি ও বাংলালিংক দুটি ব্যান্ডে তরঙ্গ বরাদ্দ নিতে আগ্রহী। এজন্য জামানত হিসেবে গ্রামীণফোন ১৫০ কোটি ও বাংলালিংক ৩০০ কোটি টাকা প্রদান করেছে। রাষ্ট্রায়ত্ত সেলফোন অপারেটর টেলিটক নিলামে অংশ না নিলেও বরাদ্দ নেয়া তরঙ্গের জন্য নিলামে নির্ধারিত মূল্য পরিশোধ করতে হবে তাদের। তবে ফোরজি লাইসেন্স নিতে আবেদনকারী রবি আজিয়াটা নিলামে অংশ নিচ্ছে না। অপারেটরটি এরই মধ্যে তাদের টুজি তরঙ্গ প্রযুক্তিনিরপেক্ষতায় রূপান্তরে আবেদন করেছে।

ফোরজির তরঙ্গ নিলামের বিষয়ে জানতে চাইলে অ্যাসোসিয়েশন অব মোবাইল টেলিকম অপারেটরস অব বাংলাদেশের (অ্যামটব) মহাসচিব নুরুল কবীর বলেন, বিশ্বব্যাপী প্রযুক্তি যেভাবে এগিয়েছে, তাতে বাংলাদেশে আরো আগেই ফোরজি চালুর প্রয়োজন ছিল। তবে এর জন্য হ্যান্ডসেটসহ প্রয়োজনীয় অন্য বিষয়গুলোকে সহজলভ্য করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুযায়ী তরঙ্গের নিলাম অনুষ্ঠিত হচ্ছে। মানসম্পন্ন সেবা দিতে অপারেটরদের হাতে আরো তরঙ্গ দিতে হবে। এক্ষেত্রে ফোরজি সেবাটিকে মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে তরঙ্গের উচ্চমূল্য বাধা হিসেবে কাজ করছে।

তরঙ্গ নিলামের নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী, আবেদন জমা নেয়ার শেষ তারিখ ছিল গত ১৪ জানুয়ারি। ২৫ জানুয়ারি যোগ্য প্রার্থীদের তালিকা প্রকাশ করা হয়। যোগ্য আবেদনকারীদের সঙ্গে নিলাম প্রক্রিয়া নিয়ে পরামর্শের জন্য নির্ধারিত দিন ছিল ২৯ জানুয়ারি। এছাড়া ৫ ফেব্রুয়ারির মধ্যে বিড আর্নেস্ট মানি পরিশোধ ও ৭ ফেব্রুয়ারি নিলামে অংশগ্রহণকারীর স্বীকৃতি বা প্রত্যাখ্যানের চিঠি পাঠানোর সময় নির্ধারিত ছিল। গতকাল নিলামের মহড়া অনুষ্ঠিত হয়। আর আগামীকাল নিলামে বিজয়ী প্রতিষ্ঠানগুলোকে নোটিস দেয়া হবে।

এদিকে নিলাম আয়োজনের এ সময়সূচির মধ্যেই গত ২৪ জানুয়ারি সেলফোন অপারেটরদের টুজি সেবায় ব্যবহূত তরঙ্গে প্রযুক্তিনিরপেক্ষতা দিতে নির্দেশনা জারি করে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। এ সুবিধা নিতে ২০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আবেদনের সময় দেয়া হয় সেলফোন অপারেটরদের। রূপান্তরের নির্ধারিত ফিও এ সময়ের জন্য প্রযোজ্য হবে। এ সময়ের পর প্রযুক্তিনিরপেক্ষতায় তরঙ্গ রূপান্তরের ক্ষেত্রে ফি নির্ধারণের বিষয়টি সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে।

নির্দেশনায় বলা হয়েছে, সরকারের অনুমোদনসাপেক্ষে অপারেটররা তাদের টুজি তরঙ্গের সবই প্রযুক্তিনিরপেক্ষ তরঙ্গ হিসেবে রূপান্তর করে নিতে পারবে। এজন্য নির্ধারিত ফি প্রদান করতে হবে তাদের। টুজির সব তরঙ্গ রূপান্তরের ক্ষেত্রে মেগাহার্টজপ্রতি ফি ধরা হয়েছে ৪০ লাখ ডলার বা ৩৩ কোটি ২০ লাখ টাকা (ডলারপ্রতি ৮২ টাকা ৯০ পয়সা হিসাবে)। আর কোনো অপারেটর চাইলে তরঙ্গের অংশবিশেষও রূপান্তর করতে পারবে। তবে এজন্য দিতে হবে বেশি অর্থ। সেক্ষেত্রে প্রতি মেগাহার্টজের জন্য অপারেটরটিকে গুনতে হবে ৭৫ লাখ ডলার বা ৬২ কোটি ১৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা। অনুমোদন পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে সম্পূর্ণ অর্থ পরিশোধের বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে। এর সঙ্গে দিতে হবে মূল্য সংযোজন কর। ১৫ বছরের জন্য তরঙ্গের এ রূপান্তরের অনুমোদন দেয়া হবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিলামের আগেই সেলফোন অপারেটরদের বিদ্যমান টুজি তরঙ্গের প্রযুক্তিনিরপেক্ষতা দেয়ার সুযোগ দিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। ফলে আসন্ন তরঙ্গ নিলাম কার্যত প্রতিযোগিতাহীন হয়ে পড়েছে। নিলামে মাত্র দুটি অপারেটর অংশ নেয়ায় অব্যবহূত তরঙ্গের বড় একটি অংশই অবিক্রীত থেকে যাবে বলে মনে করছেন তারা।

এর আগে ১৮০০ ও ২১০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডের অব্যবহূত তরঙ্গ বিক্রিতে ২০১৫ সালে নিলাম আয়োজনের উদ্যোগ নেয় বিটিআরসি। তবে অপারেটরদের অনাগ্রহের কারণে ওই সময় নিলাম আয়োজন করতে পারেনি সংস্থাটি। নিলাম আয়োজনে ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ১৮০০ ও ২১০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডের তরঙ্গ বরাদ্দ নীতিমালা প্রকাশ করা হয়। নীতিমালা অনুযায়ী নিলামের তারিখ নির্ধারণ করা হয় ওই বছরের ৩০ এপ্রিল। পরবর্তীতে এ তারিখ পিছিয়ে প্রথমে ২০ মে এবং এরপর ২৭ মে নির্ধারণ করে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। তবে সেলফোন অপারেটররা নিলামে অংশ নেয়ার বিষয়ে আগ্রহ না দেখানোয় তা স্থগিত করা হয়।

নীতিমালায় ১৮০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডে তরঙ্গের ভিত্তিমূল্য ধরা হয় মেগাহার্টজপ্রতি ৩ কোটি ডলার (২৩২ কোটি টাকা)। আর ২১০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডে ২ কোটি ২০ লাখ ডলার (১৭০ কোটি টাকা) মেগাহার্টজপ্রতি ভিত্তিমূল্য নির্ধারণ করে বিটিআরসি। পরবর্তীতে নীতিমালাটি সংশোধনের উদ্যোগ নেয়া হয়। সংশোধিত নীতিমালায় দুই ব্যান্ডের তরঙ্গ নিলামের ক্ষেত্রেই ভিত্তিমূল্য নির্ধারণ করা হয় ২ কোটি ৫০ লাখ ডলার।

প্রসঙ্গত, ২০১৩ সালে অনুষ্ঠিত হয় থ্রিজির তরঙ্গ বরাদ্দের নিলাম। ওই নিলামে ৪ হাজার ২৫৭ কোটি টাকা আয় করে সরকার।

১০ শতাংশ ভ্যাট: এদিকে ফোরজি লাইসেন্স ও তরঙ্গের ওপর ১০ শতাংশ ভ্যাট আরোপের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এজন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ে সারসংক্ষেপও পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন পেলে নিলামের আগেই আদেশ জারি করা হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

প্রাথমিকভাবে ফোরজি লাইসেন্স ও তরঙ্গ নিলামের ওপর ১২ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করতে চেয়েছিল এনবিআর। এর মাধ্যমে ৭৫০ কোটি টাকা আহরণের পরিকল্পনা ছিল রাজস্ব আহরণকারী সংস্থাটির। অপারেটরদের আপত্তির মুখে গতকাল সব পক্ষের সঙ্গে বসে ১০ শতাংশ ভ্যাট চূড়ান্ত করে অনুমোদনের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ে সারসংক্ষেপ পাঠানো হয়েছে। ১০ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করা হলে এ খাত থেকে সরকার ৬২৫ কোটি টাকার রাজস্ব পাবে।


ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন :

টি মন্তব্য
মন্তব্যে প্রকাশিত যেকোন কথা মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। DeshReport.com-এর সম্পাদকীয় অবস্থানের সঙ্গে এসব অভিমতের কোন মিল নেই। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নিবে না

আরো সংবাদ...

মন্তব্য করুন