জাতীয়প্রধান সংবাদরাজনীতি

মীমাংসায় আবার বিদেশি সহায়তা চেয়েছে বিএনপি

নিজস্ব প্রতিবেদক: দুইবার উদ্যোগ ব্যর্থ হলেও বাংলাদেশে রাজনৈতিক বিরোধের মীমাংসায় আবার বিদেশি সহায়তা চেয়েছে বিএনপি। বিশ্বের স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোর সংস্থা জাতিসংঘ, সাবেক ব্রিটিশ শাসনে থাকা দেশগুলোর সংস্থা কমনওয়েলথ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নকে সহায়তার এই অনুরোধ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিএনপি নেতারা।

পুরো বিষয়টিই করা হয়েছে গোপনীয়তার সঙ্গে। ফলে চিঠির বিষয়বস্তু নিয়ে বিস্তারিত বলতে চাইছেন না নেতারা। যদিও নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে একাধিক নেতা ও বিএনপি চেয়ারপারসন কার্যালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগামী নির্বাচন বিএনপির অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে চাইছেন তারা। এ বিষয়ে উদ্যোগ নেয়ার অনুরোধ করা হয়েছে।

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নামে জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের ঢাকার কার্যালয়ে বার্তা বাহকের মাধ্যমে এই চিঠি দেওয়া হয়। আর কমনওয়েলথ মহাসচিবের কাছে চিঠিটি পাঠানো হয়েছে ই-মেইলে।

বুধবার ঢাকাস্থ জাতিসংঘের আবাসিক প্রতিনিধি মিয়া শেপুর মাধ্যমে মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুটেরেস বরাবর এ চিঠি পাঠায় বিএনপি। একইসঙ্গে ঢাকাস্থ ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত এবং কমনওয়েলথ পার্লামেন্টের বিশেষ দূতের কাছে একই চিঠি দিয়েছে দলটি।

জানতে চাইলে বিএনপি চেয়ারপারসনের প্রেস উইংয়ের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক প্রভাবশালী সংস্থাগুলোর কাছে চিঠি দেয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে এদের সহায়তা চাওয়া হয়েছে।’

চিঠিতে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের আগে ঢাকায় জাতিসংঘের রাজনীতি বিষয়ক সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোর মধ্যস্থতার চেষ্টার কথাও চিঠিতে উল্লেখ আছে।

তবে বাংলাদেশে রাজনৈতিক বিরোধের মীমাংসায় জাতিসংঘ বা কমনওয়েলথের উদ্যোগ কখনও সফল হয়নি। ১৯৯৩ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে কমনওয়েলথের দূত স্যার নিনিয়ান স্টিফেন যেমন ব্যর্থ হয়েছেন, তেমনি ২০১৩ সালে হতাশা নিয়ে ফিরেছেন জাতিসংঘের বিশেষ দূত অস্কার ফার্নান্দেস তারানকো।

অতীত অভিজ্ঞতা ভালো না হলেও বিএনপি আবার কোন আশায় আন্তর্জাতিক উদ্যোগ চাইছে-জানতে বিএনপির কূটনৈতিক কোরের সদস্য ও বিশেষ সম্পাদক আসাদুজ্জামান রিপনের ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি তা রিসিভ করেননি।

কূটনৈতিক কোরের আরেক সদস্য বিএনপিরসহ আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক রুমিন ফারহানা তার ফোন বন্ধ করে রেখেছেন।

দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ধরলেও তিনি ব্যস্ত আছেন জানিয়ে কিছু বলেননি। তবে চিঠি দেয়া হয়েছে, এই বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন তিনি।

বিএনপি চেয়ারপারসন কার্ালয়ের ওই কর্মকর্তা জানান, চিঠিতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও মানবাধিকার পরিস্থিতির পাশাপাশি দলীয় প্রধানের সাজা দেয়ার কথা জানানো হয়েছে।

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় গত ৮ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়ার পাঁচ বছরের কারাদণ্ড হয়েছে। বাংলাদেশের সাবেক কোনো প্রধানমন্ত্রীর দুর্নীতির দায়ে সাজা পেয়ে জেলে যাওয়ার ঘটনা এর আগে ঘটেনি।

আন্তর্জাতিক তিন সংস্থাকে দেয়া চিঠিতে এই মামলাটিকে মিথ্যা দাবি করে বলা হয়েছে, খালেদা জিয়াকে সাজা ছাড়াই আগামী সংসদ নির্বাচন করার ষড়যন্ত্র করছে সরকার। এই মামলায় সরকার হস্তক্ষেপ করছে বলেও অভিযোগ করা হয় অভিন্ন ভাষায় লেখা চিঠিতে।

এর বাইরে বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা, বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক অধিকার না থাকা এবং মানবাধিকার পরিস্থিতি খারাপ বলে উল্লেখ করা হয়েছে চিঠিতে।

কমনওয়েলথের ব্যর্থ উদ্যোগ

৯০ দশকে বিএনপি সরকারের আমলে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আওয়ামী লীগের আন্দোলনের সময় সমঝোতা করতে আসেন কমনওয়েলথের মহাসচিব এমেকা এনিয়াওকুর বিশেষ দূত স্যার নিনিয়ান স্টিফেন। ১৯৯৪ সালের ১৩ অক্টোবর তিনি ঢাকায় এসে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে বৈঠক করেন।

এক পর্যায়ে নিনিয়ান সে সময়ের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ১১ সদস্যের সর্বদলীয় মন্ত্রিসভা গঠনের কথা বলেন। এই সরকারে বিরোধী দলের পাঁচজন মন্ত্রী থাকার প্রস্তাব করেন তিনি। আওয়ামী লীগ এই দাবি নাকচ করে দেয়। ওই বছরের  ২৮ ডিসেম্বর পঞ্চম সংসদের ১৪৭ জন বিরোধীদলীয় সদস্য একযোগে পদত্যাগ করেন। এরপর শুরু হয় টানা হরতাল-আন্দোলন।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি না মেনে ’৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ষষ্ঠ সংসদ নির্বাচন করে বিএনপি। আওয়ামী লীগ এই নির্বাচন বর্জন করে আন্দোলন করতে থাকে। ১৯৯৬-এর ৯ মার্চ থেকে সারা দেশে অনির্দিষ্টকালের হরতাল ডাকে আওয়ামী লীগ।

আওয়ামী লীগের আন্দোলন সত্ত্বেও খালেদা জিয়া ২৭ সদস্যের নতুন মন্ত্রিসভা গঠন করে নতুন সংসদ অধিবেশন শুরু করেন। ২১ মার্চ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন বসে। এরপর ব্যাপক আন্দোলনের মুখে ওই অধিবেশনেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিল আনা হয়। এরপর সে সময়ের রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাস ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ বিলুপ্ত ঘোষণা করেন এবং সাবেক প্রধান বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হন।

জাতিসংঘের ব্যর্থ উদ্যোগ

আওয়ামী লীগের গত আমলে উচ্চ আদালতের রায়ের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে সংসদ। আর এই সরকার ফিরিয়ে আনতে আন্দোলনে যায় বিএনপি। কিন্তু সরকার তা অগ্রাহ্য করে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যায়।

২০১৩ সালে সমঝোতার চেষ্টায় বাংলাদেশে আসেন জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূত অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকো

বিএনপি-জামায়াত জোটের আন্দোলনে ব্যাপক সহিংসতার মধ্যে তৈরি হয় উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। এই পরিস্থিতিতে ২০১৩ সালের ৬ ডিসেম্বর রাতে সমঝোতার চেষ্টায় জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ বার্তা নিয়ে ঢাকা আসেন অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের প্রতিনিধি দল। এতে জাতিসংঘের রাজনৈতিক বিভাগের দুই জন, নির্বাচন বিভাগের এক জন কর্মকর্তা এবং একজন মধ্যস্থতা বিশেষজ্ঞ ছিলেন।

পাঁচ দিনের সফরে এসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সে সময়ের বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া, জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, সে সময়ের প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকীব উদ্দীন আহমেদ, আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াতের শীর্ষ নেতা, নাগরিক সমাজের কয়েকজন প্রতিনিধি, বিদেশি কূটনীতিক ও বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করেন।

১১ ডিসেম্বর তারানকোর ফিরে যাওয়ার কথা থাকলেও পরে তা আরও ২৪ ঘণ্টা বাড়ানো হয়। কিন্তু এতেও কাজ হয়নি আর সংবাদ সম্মেলনে হতাশা জানিয়ে ১২ ডিসেম্বর ঢাকা ছাড়েন তারানকো এবং তার সহযোগিরা।

আর এই পরিস্থিতিতে বিএনপি-জামায়াত জোট এবং সমমনাদেরকে ছাড়াই ব্যাপক সহিংসতার মধ্যেই ভোট হয়। অবশ্য ১৫৩ আসনে একক প্রার্থী থাকায় তারা নির্বাচিত হয়ে যান বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়।

আওয়ামী লীগ এবারও সংবিধান অনুসারে নির্বাচিত সরকারের অধীনেই নির্বাচন করতে অনঢ়। যদিও বিএনপি নির্বাচনকালীন নির্দলীয় বা সহায়ক সরকারের দাবি জানিয়ে আসছে।


ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন :

টি মন্তব্য
মন্তব্যে প্রকাশিত যেকোন কথা মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। DeshReport.com-এর সম্পাদকীয় অবস্থানের সঙ্গে এসব অভিমতের কোন মিল নেই। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নিবে না

আরো সংবাদ...

মন্তব্য করুন