প্রধান সংবাদসারাবিশ্ব

ট্রাম্প-কিম বৈঠক নতুন অধ্যায়ের সূচনা

এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো সিঙ্গাপুরে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ নেতা কিম জং উনের মধ্যে সম্পন্ন হলো ঐতিহাসিক বৈঠক। গতকাল মঙ্গলবার সিঙ্গাপুরের সেন্তোসা দ্বীপের পাঁচ তারকা হোটেল ক্যাপেলায় এ বৈঠকে দুই নেতা সামরিক হামলার হুমকি-ধমকির অবসান ঘটিয়ে এলেন শান্তি প্রতিষ্ঠার সমঝোতায়। বৈঠকে ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, কোরীয় উপদ্বীপে ‘যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা’ বন্ধ করবেন। অন্যদিকে কিম প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, পরমাণু নিরস্ত্রীকরণের। দুই নেতার এমন প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি একটি যৌথ চুক্তিপত্রও স্বাক্ষর করেছেন তারা। বহুদিনের কাঙ্ক্ষিত এ বৈঠককে সফল বলেই দাবি করছেন ট্রাম্প ও কিম। দুই নেতার এ সফল বৈঠকে বিশ্বনেতারাও সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। এরই মধ্যে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, রাশিয়া ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন। বিশ্ববাসীরও নজর ছিল এই বৈঠকে। খবর নিউইয়র্ক টাইমস, ওয়াশিংটন পোস্ট ও বিবিসির।

সিঙ্গাপুরের ক্যাপেলা হোটেলে নির্ধারিত বৈঠক কক্ষে প্রথমে হাজির হন উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন। এরপর আসেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তারা দু’জনে টানা ৩৫ মিনিট একান্ত বৈঠক করেন। এরপর বিরতিতে যান দুই নেতা। বিরতি থেকে ফিরে তারা উভয় দেশের কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়ে দ্বিতীয় ধাপের বৈঠকে বসেন। এ সময় নানা ধরনের আলোচনার পাশাপাশি একটি যৌথ চুক্তিপত্রে সই করেন ট্রাম্প ও কিম। চুক্তি স্বাক্ষর শেষে সাংবাদিকদের সামনে নথি নিয়ে আসেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। সেখান থেকেই সাংবাদিকরা দুই নেতার সহাস্য করমর্দনের ছবি তোলেন। তবে তখনই চুক্তির বিস্তারিত প্রকাশ করেননি তারা।

আলোচনা ফলপ্রসূ হয়েছে উল্লেখ করে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, একটি চুক্তিতে সই করেছি আমরা। এই চুক্তির জন্য আমরা দু’জনই গর্বিত। আসলে আমরা দু’জনে একটা ভালো কিছু করতে চাই।

চুক্তির ব্যাপারে বিস্তারিত জানাতে বিকেলে সংবাদ সম্মেলন করেন ট্রাম্প। তখন তিনি বলেন, কোরীয় উপদ্বীপে ‘পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ’-এর অঙ্গীকার করেছে উত্তর কোরিয়া। উত্তর কোরিয়ার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞার ব্যাপারে ট্রাম্প বলেন, আমরা যখন পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের বিষয়ে সম্পূর্ণ নিশ্চিত হতে পারব, তখনই উত্তর কোরিয়ার ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হবে। আসলে আমি এই নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে চাই। উত্তর কোরিয়ায় যুদ্ধবন্দি যুক্তরাষ্ট্রের সেনা সদস্যদের দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়েও সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানান ট্রাম্প। তিনি বলেন, আজকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করে আশানুরূপ উত্তর পেয়েছি আমি। কিমের সঙ্গে বৈঠক আশার চেয়েও বেশি ফলপ্রসূ হয়েছে।

বৈঠকে মানবাধিকার বিষয়ে আলোচনার কথাও জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট। ট্রাম্প বলেন, কিমের সঙ্গে মানবাধিকার বিষয়েও সংক্ষিপ্ত আলোচনা হয়েছে। কিম উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার স্থানগুলো ধ্বংস করছেন বলে জানিয়েছেন। ট্রাম্প বলেন, এরই মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার প্রধানস্থল ধ্বংস করেছেন কিম।

সংবাদ সম্মেলনে কিমের সম্পর্কে জানতে চান সাংবাদিকরা। এ সময় কিমের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে যান ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেন, কিম একজন প্রতিভাবান ব্যক্তি। খুব কম বয়সে উত্তর কোরিয়ার ক্ষমতায় এসে দেশ পরিচালনা করছেন তিনি। আমি কিমকে খুবই বিশ্বাস করি।

বৈঠক শেষে কিম সাংবাদিকদের বলেন, বৈঠক আয়োজন করার জন্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রতি তিনি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছেন। দোভাষীর সাহায্যে কিম বলেন, ঐতিহাসিক এক বৈঠক হয়েছে। অতীতকে পেছনে ঠেলে ঐতিহাসিক একটি নথিতে সই করেছি। বিশ্ববাসীর চাওয়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে তিনি বলেন, বিশ্ব ব্যাপক একটি পরিবর্তন দেখবে।

ট্রাম্পের সঙ্গে কিমের বৈঠকে যে সমঝোতা হয়েছে, তার দিক সম্পর্কে বিবিসির সাংবাদিক লরা বিকার বলেন, চারটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সমঝোতায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সেগুলো হলো- দুই দেশের জনগণের শান্তি ও সমৃদ্ধির স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্র ও উত্তর কোরিয়া নতুন ধারার সম্পর্কের সূচনা করবে, কোরীয় উপদ্বীপের স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করবে দুই দেশ, ২৭ এপ্রিলের পানজামুন ঘোষণা অনুযায়ী পূর্ণাঙ্গ পরমাণু নিরস্ত্রীকরণের প্রক্রিয়া শুরু করবে দুই দেশ, যুদ্ধবন্দিদের উদ্ধারে অঙ্গীকার করেছে উত্তর কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র। ইতিমধ্যে যাদের শনাক্ত করা গেছে তাদের নিজ নিজ দেশে শিগগিরই প্রত্যাবাসন শুরু করবে উত্তর কোরিয়া।

এদিকে ট্রাম্প ও কিমের বৈঠককে উত্তর কোরিয়ার কূটনৈতিক বিজয় বলেই দেখছেন অনেক বিশ্নেষক। তাদের দাবি, ট্রাম্প উত্তর কোরিয়ার জন্য অনেক বড় প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে ওই বিশ্নেষকদের দাবি উড়িয়ে দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তিনি সিঙ্গাপুর থেকে ফেরার আগে বলেন, আমরা কোনো ছাড় দেইনি। কিম জং উনের সঙ্গে দেখা করতে রাজি হওয়া ছাড়া আর কোনো কিছুতেই ছাড় দেইনি আমরা।

তিনি বলেন, শুধু ট্রাম্পকে যারা অপছন্দ করেন, তারাই বলবেন যে আমরা অনেক বড় কোনো প্রতিশ্রুতি দিয়েছি।

এদিকে ট্রাম্প-কিমের বৈঠক নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছে চীন, রাশিয়া, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া। চীনের সংবাদ সংস্থা সিনহুয়ায় প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এই বৈঠক কোরীয় উপদ্বীপের পারমাণবিক অস্ত্র ইস্যুর একটি রাজনৈতিক সমাধানের আশা তৈরি করেছে। তবে এক ঘণ্টার বৈঠক নয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা করে উন্নয়নের পথে যাত্রার জন্য প্রয়োজন জ্ঞান ও ধৈর্য। এরকম ক্ষেত্রে প্রথম পদক্ষেপটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও কঠিন। তবে সেটি ইতিবাচক।


ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন :

টি মন্তব্য
মন্তব্যে প্রকাশিত যেকোন কথা মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। DeshReport.com-এর সম্পাদকীয় অবস্থানের সঙ্গে এসব অভিমতের কোন মিল নেই। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নিবে না

আরো সংবাদ...

মন্তব্য করুন