জাতীয়সারাদেশ

তীব্র কর্ম সংকটে সুনামগঞ্জের হাওরবাসী

কাজের অভাবে এলাকা ও দেশ ছেড়ে যেতে হয় বলে খেদ প্রকাশ করেছেন সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের কৃষকরা। কর্ম সংকটের কথা জানিয়ে জামালগঞ্জ উপজেলার পাকনার তীরবর্তী ফেনারবাঁক গ্রামের হতদরিদ্র কৃষক শামীম চৌধুরী বলেন, ‘বাইশা মাসো হাত-পাঁও বাইন্দা ঘরো বইয়া থাকন লাগে, কোনও কামকাজ নাই, এর লাইগা আমরা বিদেশ করি।’

একই গ্রামের সচ্ছল কৃষক হাজী নরুল হুদা চৌধুরী জানান, বৈশাখ মাসের পর হাওর এলাকায় কোনও কাজ থাকে না। কৃষকরা যা ধান পেয়েছিলেন তা বিক্রি করে দিয়ে মহাজনের দেনা পরিশোধ করেছেন। এখন জীবন বাঁচানোর তাগিদে তারা আবার শহরমুখী হয়েছেন।

স্থানীয়রা জানান, সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলার চারদিকে পাকনার হাওর বেষ্টিত ফেনারবাঁক গ্রাম। পূর্বপাড়া, পশ্চিমপাড়া ও মধ্যপাড়াসহ পৃথক তিনটি পাড়ায় বিভক্ত গ্রামটি। বর্ষার শুরুতে আষাঢ় মাসে বসতবাড়ির সামনে-পেছনে আছড়ে পড়ে পাকনার হাওরের  উত্তাল ঢেউ। গ্রামের সামনে থেকে পেছনে তাকালে  হাওরের বিশাল জলরাশি আর মাছ ধরার দুই একটা ছোট নৌকা ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়ে না। যত দূর চোখ যায় শুধু পানি আর পানি।

বছরের ৮ মাসই পানিতে ডুবে থাকে হাওরের ক্ষেত

জানা যায়, এবছর বোরোর বাম্পার ফসল হলেও পাকনার হাওর তীরবর্তী ফেনারবাঁক ইউনিয়নের ফেনারবাঁক, লক্ষ্মীপুর, শান্তিপুর, ভেদারপুর, বিজয়নগর,পশ্চিম ফেনারবাঁক, রাজাপুর, উদয়পুর, নাজিমনগর, হটামারাসহ ১০টি গ্রামের মানুষের মধ্যে বাম্পার ফলনের কোনও উচ্ছ্বাস নেই। হাওরের বিশাল জলরাশি আর এসব গ্রামের মানুষের চোখের জলধারা মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পরপর দুইবার আগাম বন্যার কারণে ফসলহানির পর এবছরও তারা বোরো আবাদ নিয়ে বিপাকে পড়েন। কারণ হাওরের পানি দেরিতে নিষ্কাষণের ফলে তাদের ধানের চারাগাছগুলো বীজতলাতেই পেকে যায়। এছাড়া বিলম্বে ধান রোপণের কারণে তাদের জমিতে ফসল উৎপাদনের ক্ষমতাও অনেকাংশে হ্রাস পেয়েছে। এক হাল (১২ কেয়ার) জমি চাষাবাদ করতে ৩৬ হাজার টাকা খরচ হলেও ধান পেয়েছেন মাত্র ৬০ থেকে ৭০ মণ, যা বিক্রি করে চাষাবাদের খরচের টাকাই ওঠেনি। অথচ স্বাভাবিকভাবে ধান উৎপাদন হলে প্রতি হাল জমিতে দেড়শ’ থেকে দুইশ’ মণ ধান উৎপাদন হওয়ার কথা। যে ধানটুকু তারা পেয়েছিলেন তাও অতিবৃষ্টির কারণে শুকোতে পারেননি। ফলে ধানের রঙ নষ্ট হয়ে যাওয়ায় মাত্র  চারশ’ থেকে পাঁচশ’ টাকা দরে ধান বিক্রি করে ধারদেনা পরিশোধ করে তাদের ভাড়ার শূন্য হয়েছে।

পানিবন্দি স্কুল

ফেনারবাঁক পশ্চিমপাড়া এলাকার সাজন মিয়া, মিজানুল ইসলাম, সবুজ মিয়া, বিপুল মিয়া, তৌফিক মিয়া, মমিন মিয়াসহ তাদের গ্রামের দেড়শতাধিক পরিবার গত জৈষ্ঠ্য মাসে কাজের সন্ধানে ঘরবাড়ি ছেড়ে ঢাকা, সিলেট, কাঁচপুর, বিয়ানীবাজার, থানাবাজার, কোম্পানীগঞ্জ ভোলাগগঞ্জ, বটেশ্বনসহ বিভিন্ন জায়গায় কাজের জন্য চলে গেছেন। এ ব্যাপারে ফেনারবাঁক গ্রামের জিয়াউল করিম বলেন, ‘কানাইখালি খাল খনন না করায় পাকনার হাওরের এ অংশে স্থায়ী জলাবদ্বতা সৃষ্টি হয়েছে। তাই এসব এলাকার মানুষ সময়মতো ফসল চাষাবাদ করতে পারে না। তাই কৃষকরা বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।’

বেসরকারি উন্নয়নকর্মী জুলফিকার চৌধুরী রানা বলেন, ‘হাওর এলাকায় ৮ মাস কর্মসংকট থাকে। এসময় হাজার হাজার কর্মক্ষম  নারী-পুরুষ বেকার সময় কাটায়। কেউ কেউ আবার কাজের সন্ধানে দেশের বিভিন্ন জায়গায় পাড়ি দেন। কেউ গার্মেন্টসে, কেউ বালি পাথর কোয়ারিতে আবার কেউ বড়ো বড়ো শহরে রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন।’

ফেনারবাঁক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আলী হোসেন বলেন, ‘হাওর এলাকায় কর্মসংকটের কারণে স্কুলের ২১০ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ৪০ জন শিক্ষার্থী গ্রাম ছেড়ে চলে গেছে।’

হাওরের জীবন

হাওর অ্যাডভোকেসি প্ল্যাটফরম (হ্যাপ)-এর যুগ্ম আহ্বায়ক শরিফুজ্জামান শরিফ বলেন, ‘হাওর এলাকার একটি বিশাল জনগোষ্ঠী জলমহালের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় এসব জলমহাল জেলেদের নামে ইজারা নিয়ে নিয়ন্ত্রণ করেন প্রভাবশালীরা। অনেক দিন ধরে দাবি করা হচ্ছিল তা প্রকৃত মৎস্যজীবীদের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য কিন্তু তা হয়নি। হতদরিদ্র মৎস্যজীবীদের সচ্ছলতা না থাকায় হাওরে বেকার সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। এছাড়া দীর্ঘ দিন ধরে নদী  খনন না করায় বিভিন্ন  হাওরে স্থায়ী  জলাবদ্ধতাও দেখা দিয়েছে। এসব কারণে কৃষক ও মৎস্যজীবীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।’

এ প্রসঙ্গে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘হাওরে বেকারত্ব ও কর্মসংকট দূর করতে হলে নেট পদ্ধতিতে মাছ চাষের ওপর বিশেষ নজর দিতে হবে। কারণ, প্লাবন ভূমিতেও এখন উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে মাছ চাষ করা যায়। এজন্য সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থাগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে।

 

দেশরির্পোট/এনবিএস


ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন :

টি মন্তব্য
মন্তব্যে প্রকাশিত যেকোন কথা মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। DeshReport.com-এর সম্পাদকীয় অবস্থানের সঙ্গে এসব অভিমতের কোন মিল নেই। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নিবে না

আরো সংবাদ...

মন্তব্য করুন