জাতীয়প্রধান সংবাদ

মিয়ানমারের ওপর চাপ আরও বাড়ানো হবে প্রধানমন্ত্রীকে জাতিসংঘ মহাসচিব

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে মিয়ানমারের ওপর আরও চাপ বাড়ানো হবে বলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে জানিয়েছেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। তিনি বলেছেন, ‘আমরা মিয়ানমারের ওপর চাপ অব্যাহত রেখেছি। আমাদের এই চাপ আরও বাড়ানো হবে, যাতে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে কী করা উচিত, তা মিয়ানমার বুঝতে পারে।’

গতকাল রোববার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে জাতিসংঘ মহাসচিব প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতের সময় এসব কথা বলেন। সাক্ষাৎকালে ১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণ দেওয়ার সময়ের একটি ছবি শেখ হাসিনার হাতে তুলে দেন গুতেরেস। সফররত বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিমও একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।

গত শনিবার বিকেলে ঢাকায় আসেন বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট। আর শনিবার রাত ২টায় ঢাকায় পৌঁছান জাতিসংঘ মহাসচিব। জীবন বাঁচাতে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে এসে কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের অবস্থা সরেজমিনে দেখতেই তারা বাংলাদেশ সফর করছেন। আজ সোমবার সকালে তারা কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনে যাবেন। এর আগে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) প্রধান হিসেবে ২০০৮ সালে রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনে এসেছিলেন গুতেরেস। তবে জাতিসংঘ মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এটাই তার প্রথম বাংলাদেশ সফর। আর বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট বিশ্ব দারিদ্র্য নিরসন দিবস পালন অনুষ্ঠানে যোগ দিতে গত বছর ঢাকায় এসেছিলেন।

রোববার সকালে অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট কিম। বৈঠক শেষে তিনি সকাল ১১টায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আসেন। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পৌঁছান জাতিসংঘ মহাসচিব। পরে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সুরমা হলে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। এ সময় তারা রোহিঙ্গা সংকট প্রসঙ্গ এবং বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির নানা প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা করেন। পরে এ বিষয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম।

বাসস জানায়, আলোচনায় জাতিসংঘ মহাসচিব ও বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট দু’জনেই রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে মিয়ানমারের ওপর চাপ অব্যাহত রাখায় তাদের সংকল্পের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন।

প্রেস সচিব জানান, তারা দু’জনেই মূলত রোহিঙ্গা সমস্যা এবং বাংলাদেশের উন্নয়ন সম্পর্কিত বিষয়াবলি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘ মহাসচিব ও বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্টকে বাংলাদেশে স্বাগত জানিয়ে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বর্তমান অবস্থা তুলে ধরেন। ১৯৭৭ সাল থেকে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী বিভিন্নভাবে বিতাড়িত হয়ে বাংলাদেশে চলে আসতে থাকার বিষয়েও প্রধানমন্ত্রী তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

প্রেস সচিব জানান, শেখ হাসিনা তাদের বলেন, বাংলাদেশ কেবল মানবিক কারণে প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে। কেননা, এ দেশের জনগণেরও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ভারতে শরণার্থী হিসেবে অনুরূপ আশ্রয় গ্রহণের অভিজ্ঞতা রয়েছে। তিনি আরও জানান, সরকার প্রায় এক লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে একটি দ্বীপে সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে, যেখানে তারা জীবনযাপনের জন্য আরও ভালো অবস্থা পাবে।

রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে সম্পাদিত সমঝোতার উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মিয়ানমার তা বাস্তবায়নে এখনও কোনো উদ্যোগ নেয়নি। রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলায় অব্যাহত সহযোগিতার জন্য জাতিসংঘের ভূমিকার প্রশংসা করেন শেখ হাসিনা।

প্রেস সচিব জানান, আলোচনায় রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে মিয়ানমারের ওপর আরও চাপ দেওয়ার কথা বলেছেন জাতিসংঘ মহাসচিব গুতেরেস। তিনি বলেন, জাতিসংঘ মিয়ানমারের ওপর চাপ অব্যাহত রেখেছে। এই চাপ আরও বাড়ানো হবে, যাতে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে কী করা উচিত, মিয়ানমার তা বুঝতে পারে।

এ সময় বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে আশ্রয় দেওয়ায় শেখ হাসিনা সরকারের ভূয়সী প্রশংসা করেন গুতেরেস। শরণার্থী শিবিরে রোহিঙ্গাদের শিক্ষার ব্যবস্থা নিয়েও তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে কথা বলেন। বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা যাতে উগ্রপন্থায় জড়িয়ে না পড়ে, সেটাও জাতিসংঘের উদ্বেগের বিষয় বলে জানান তিনি।

প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব জানান, আলোচনায় বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট কিম মানবিক ইস্যুতে বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করার ঘোষণা দেন এবং তিনিও রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভূমিকার প্রশংসা করেন। বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট এ সময় এলডিসি থেকে উত্তরণের পরও বিশ্বব্যাংকের বোর্ডে তিনি বাংলাদেশকে কনসেশন রেটে ঋণ দেওয়ার কথা বলবেন বলেও আশ্বাস দেন। জিম ইয়ং কিম আরও বলেন, বাংলাদেশ এবার বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অঙ্কের ঋণ পাচ্ছে। এতেই প্রমাণ হয়, শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রতি তাদের আস্থা রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব আরও জানান, গুতেরেস ও জিম ইয়ং কিম বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রশংসা করেন এবং জঙ্গি নির্মূলে বাংলাদেশের কার্যক্রমেরও প্রশংসা করেন জাতিসংঘ মহাসচিব।

বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শন :প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট ও জাতিসংঘ মহাসচিব বিকেলে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শন করেন। বিকেলে তারা হলিক্রস গার্লস স্কুল পরিদর্শন করেন।

আজ রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনে যাচ্ছেন :আজ সকালে কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনে যাচ্ছেন জাতিসংঘ মহাসচিব ও বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট। সেখানে তারা রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলবেন। স্বেচ্ছায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের পরিস্থিতি কতটা সৃষ্টি হয়েছে, সে সম্পর্কেও খোঁজখবর নেবেন তারা। পরিদর্শন শেষে কক্সবাজারে প্রেস ব্রিফিংয়ে বক্তব্য দেবেন। সন্ধ্যায় তারা ঢাকা ফিরে আসবেন।

উখিয়া প্রতিনিধি জানিয়েছেন, দুই বিশ্ব সংস্থার শীর্ষ ব্যক্তিত্ব আন্তোনিও গুতেরেস ও জিম ইয়ং কিমের রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শনকে কেন্দ্র করে উখিয়া উপজেলা প্রশাসন ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে। নিরাপত্তা বেষ্টনীতে রাখা হয়েছে শরণার্থী ক্যাম্প। সড়কে যানবাহন নিয়ন্ত্রণে রাখা হবে। কক্সবাজার থেকে উখিয়া পর্যন্ত সড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে মোতায়েন করা হয়েছে ব্যাটালিয়ন পুলিশ। গোয়েন্দা নজরদারিতে রয়েছে উখিয়ার সার্বিক পরিস্থিতি।

উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা একরামুল হক ছিদ্দিক জানান, সোমবার সকাল ১১টা ৩৫ মিনিটে জাতিসংঘ মহাসচিব সফরসঙ্গীদের নিয়ে কুতুপালং শরণার্থী ক্যাম্পের ট্রানজিট পয়েন্ট ডি-৪ ব্লকের মধুরছড়া স্টেশন ক্যাম্প ও মধুরছড়া নারীবান্ধব আইএমও হাসপাতাল পরিদর্শন করবেন। এ সময় তারা রোহিঙ্গাদের থাকা, খাওয়া ও চিকিৎসার খোঁজখবর নেবেন। শুনবেন নিপীড়িত-নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের দুঃখ-কষ্টের কথা। এরপর দুপুর আড়াইটার দিকে কুতুপালং ক্যাম্পের টাই অফিস এলাকায় প্রেস ব্রিফিং করবেন তারা।

জাতিসংঘ মহাসচিব ও বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্টের সম্মানে নৈশভোজ :জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস ও বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিমের সম্মানে গতকাল নৈশভোজের আয়োজন করা হয়। সোনারগাঁও হোটেলে নৈশভোজে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অংশগ্রহণ করেন।


ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন :

টি মন্তব্য
মন্তব্যে প্রকাশিত যেকোন কথা মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। DeshReport.com-এর সম্পাদকীয় অবস্থানের সঙ্গে এসব অভিমতের কোন মিল নেই। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নিবে না

আরো সংবাদ...

মন্তব্য করুন