জাতীয়

জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ রোহিঙ্গা সমস্যার দ্রুত শান্তিপূর্ণ সমাধান চাই

রোহিঙ্গা সমস্যার স্থায়ী সমাধানে জাতিসংঘের সঙ্গে মিয়ানমারের যে চুক্তি হয়েছে তার আশু বাস্তবায়ন ও কার্যকরের তাগিদ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, যেহেতু রোহিঙ্গা সমস্যার উদ্ভব হয়েছে মিয়ানমারে, তাই এর সমাধানও হতে হবে মিয়ানমারে। আমরা দ্রুত রোহিঙ্গা সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান চাই।
স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭৩তম অধিবেশনে দেয়া ভাষণে মিয়ানমারের ভূমিকায় হতাশা প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, আমাদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও আজ পর্যন্ত মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের স্থায়ী ও টেকসই প্রত্যাবাসন শুরু সম্ভব হয়নি।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দেখানো পথ ধরে প্রতিবছরের মত এবারো জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ দেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। সন্ধ্যা ৭টা থেকে ১৯ মিনিট স্থায়ী ভাষণে রোহিঙ্গা সংকট, বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের সক্রিয় অংশগ্রহণ, সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি, বাংলাদেশের উন্নয়ন-অগ্রযাত্রা, নারীর ক্ষমতায়ন ও উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় নারীর অংশগ্রহণসহ বঙ্গবন্ধুর ক্ষুধা, দারিদ্র্য, নিরক্ষরতা ও শোষণমুক্ত সোনার বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকারের কথা বিশ্বসভায় তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। শেখ হাসিনাই বাংলাদেশের একমাত্র সরকার প্রধান, যিনি ১৫ বার সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেয়ার নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত করলেন।
শেখ হাসিনা বলেন, মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তচ্যুত ও অসহায় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর দুর্দশার স্থায়ী ও শান্তিপূর্ণ সমাধানে গত বছর সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে আমি পাঁচ-দফা প্রস্তাব পেশ করেছিলাম। মিয়ানমার আমাদের প্রতিবেশী দেশ। প্রথম থেকেই আমরা তাদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে রোহিঙ্গা সমস্যার একটা শান্তিপূর্ণ সমাধানের চেষ্টা করে যাচ্ছি। ইতোমধ্যে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার-এর মধ্যে একাধিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। তবে, মিয়ানমার মৌখিকভাবে সবসময়ই রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেবে বলে অঙ্গীকার করলেও বাস্তবে তারা কোন কার্যকর ভূমিকা নিচ্ছে না।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে অবস্থানরত ১১ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠি মানবেতর জীবনযাপন করছে। আমরা সাধ্যমত তাদের জন্য খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসা, নিরাপত্তা, শিশুদের যত্মের ব্যবস্থা করেছি। এ ক্ষেত্রে জাতিসংঘ, কমনওয়েলথ, ওআইসিসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা সহানুভুতি দেখিয়েছেন এবং সাহায্য ও সহযোগিতা করে যাচ্ছেন। এজন্য আমি তাদের সকলের প্রতি জানাই কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গারা যতদিন তাদের নিজ দেশে ফেরত যেতে না পারবেন, ততদিন সাময়িকভাবে তারা যাতে মানসম্মত ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশে বসবাস করতে পারেন, সে জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ সকল ধরনের সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা রেখে আমরা নতুন আবাসন নির্মাণের কাজ শুরু করেছি। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে এ কাজে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়ার জন্য আহ্বান জানাচ্ছি। একইসঙ্গে রোহিঙ্গারা যাতে সেখানে যেতে পারেন তার জন্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সহযোগিতা চান প্রধানমন্ত্রী।
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাতেশের অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, গত ৩০ বছরে বাংলাদেশ জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের অধীনে ৫৪টি মিশনে এক লাখ আটান্ন হাজার ৬১০ জন শান্তিরক্ষী প্রেরণের মাধ্যমে বিশ্বশান্তি রক্ষায় বিশেষ অবদান রেখেছে। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বাংলাদেশের ১৪৫ জন শান্তিরক্ষী জীবনদান করেছেন। বর্তমানে ১০টি মিশনে ১৪৪ জন নারী শান্তিরক্ষীসহ বাংলাদেশের মোট সাত হাজারের অধিক শান্তিরক্ষী নিযুক্ত রয়েছেন। আমাদের শান্তিরক্ষীগণ তাদের পেশাদারিত্ব, সাহস ও সাফল্যের জন্য প্রশংসিত হয়েছেন। এছাড়া পিসকিপিং ক্যাপাবিলিজ রিডিনেস সিস্টেমে ২৩টি ক্ষেত্রে অবদানের জন্য আমরা অঙ্গীকার করেছি।
নিরাপদ, নিয়মিত ও নিয়মতান্ত্রিক অভিবাসন বিষয়ক গ্লোবাল কমপ্যাক্ট-এর মূল প্রবক্তা হিসেবে আমরা আরও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন এবং মানবাধিকার কেন্দ্রিক একটি কম্প্যাক্ট প্রত্যাশা করেছিলাম। বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে অভিবাসনবিষয়ক এই কম্প্যাক্টকে আমরা স্বাগত জানাই এবং অভিবাসীদের অধিকার রক্ষায় এটি একটি ক্রমঃপরিবর্ধনশীল দলিল হিসেবে কাজ করবে বলে আমি বিশ্বাস করি।
প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে বলেন, বাংলাদেশ সন্ত্রাসবাদসহ সকল সংঘবদ্ধ অপরাধের বিরুদ্ধে। বাংলাদেশের ভূখণ্ডে প্রতিবেশী দেশগুলোর স্বার্থবিরোধী কোন কার্যক্রম বা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে আমরা পরিচালিত হতে দিব না। সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলায় আমাদের জিরো টলারেন্স নীতি অব্যাহত থাকবে। সহিংস উগ্রবাদ, মানবপাচার ও মাদক প্রতিরোধে আমাদের সমাজের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষকে সম্পৃক্ত করার নীতি বিশেষ সুফল বয়ে এনেছে। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে গৃহীত গ্লোবাল কল টু অ্যাকশন অন টবড ড্রাগ প্রবলেম-এর সঙ্গে বাংলাদেশ একাত্মতা ঘোষণা করেছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০০৯ সাল থেকে আমরা অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জনকল্যাণমুখী উন্নয়ন নীতিমালা বাস্তবায়ন করে চলেছি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পথে আমরা জনগণের সকল প্রত্যাশা পূরণে সচেষ্ট রয়েছি। তিনি এ প্রসঙ্গে বলেন, বিশ্বব্যাংক ২০১৫ সালে আমাদের নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। মোট দেশজ উৎপাদনের বিবেচনায় বাংলাদেশ আজ বিশ্বের ৪৩তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ। আমাদের মাথাপিছু আয় ২০০৬ সালের ৫৪৩ মার্কিন ডলার থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২০১৮ সালে ১ হাজার ৭৫১ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার গত অর্থবছরে ছিল শতকরা ৭ দশমিক ৮৬ ভাগ। মূল্যস্ফীতি বর্তমানে ৫ দশমিক ৪ শতাংশে হ্রাস পেয়েছে। দারিদ্র্যের হার ২০০৬ সালের শতকরা ৪১ দশমিক ৫ ভাগ থেকে শতকরা ২১ দশমিক ৮ ভাগে হ্রাস পেয়েছে। একই সময়ে হত দরিদ্রের হার ২৪ শতাংশ থেকে ১১ দশমিক ৩ শতাংশে নেমে এসেছে।
শেখ হাসিনা তার সরকারের সাফল্য তুলে ধরে বিশ্বসভায় বলেন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২০০৮-০৯ অর্থবছরে ছিল ৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০১৮ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। সরকারি বিনিয়োগ ২০০৯ সালে ছিল শতকরা ৪ দশমিক ৩ ভাগ। ২০১৮ সালে তা ৮ দশমিক ২ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২০০৯ সালের ৩ হাজার ২০০ মেগাওয়াট হতে ২০১৮ সালে ২০ হাজার মেগাওয়াটে বৃদ্ধি পেয়েছে। টেকসই বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে আমরা কয়লাভিত্তিক সুপারক্রিটিক্যাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করছি। সঞ্চালন লাইনবিহীন প্রত্যন্ত অঞ্চলে পাঁচ দশমিক পাঁচ (৫.৫) মিলিয়ন সোলার প্যানেল স্থাপনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। দেশের ৯০ শতাংশ জনগণ বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় এসেছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজ শুরুর মাধ্যমে আমরা পারমাণবিক শক্তির নিরাপদ ব্যবহার যুগে প্রবেশ করেছি।
প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে আরো বলেন, বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের বৈশ্বিক মডেল হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে। আমরা স্বল্পোন্নত দেশ হতে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের যাত্রা শুরু করেছি। আমাদের স্বল্পোন্নত দেশ হতে উত্তরণের এই যাত্রাপথ আমাদের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার পরিকল্পনার সাথে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত, যা আমাদের সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। আমরা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার বাস্তবায়নে পুরোপুরি অঙ্গীকারাবদ্ধ।
তিনি বলেন, বর্তমান অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে বিনিয়োগের ব্যাপক এবং অপরিসীম সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য কর রেয়াত, দ্বৈতকর পরিহার, শুল্কছাড়সহ বিভিন্ন আর্থিক প্রণোদনা দেয়া হচ্ছে। আমরা ১০০টি নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল সৃষ্টি করছি যা প্রায় দশ মিলিয়ন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে।
জাতিসংঘ মহাসচিব ও বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্টের যৌথ উদ্যেগে ১১টি দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানের সমন্বয়ে গঠিত বিশেষজ্ঞ প্যানেলের সদস্য হিসেবে, আমি বৈশ্বিক নেতৃবৃন্দের কাছে পানির যথাযথ মূল্যায়ন, ব্যবস্থাপনা এবং এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানাই। অন্যথায় আমরা আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে দায়ী থাকব।
সকলের জন্য সুপেয় পানি ও স্যানিটেশনের ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ এবং এ বিষয়ক টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা-৬ বাস্তবায়নে আমার সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। ইতোমধ্যে, বাংলাদেশের ৯৯ শতাংশ মানুষ স্যানিটেশন এবং ৮৮ শতাংশ মানুষ সুপেয় পানির সুবিধা পাচ্ছেন।
সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় ছয় দশমিক পাঁচ (৬ দশমিক ৫) মিলিয়ন বয়স্ক  নারী-পুরুষ, বিধবা বা স্বামী পরিত্যক্ত নারী এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তি নিয়মিত ভাতা পাচ্ছেন। ২০১০ সাল থেকে প্রাক-প্রাথমিক হতে মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ করা হচ্ছে। চলতি বছর তেতাল্লিশ দশমিক সাত-ছয় (৪৩ দশমিক ৭৬) মিলিয়ন শিক্ষার্থীর মধ্যে তিনশ চুয়ান্ন দশমিক নয়-দুই (৩৫৪ দশমিক ৯২) মিলিয়ন বই বিতরণ করা হয়েছে। দৃষ্টিহীনদের জন্য ব্রেইল পদ্ধতির বই এবং ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠির শিক্ষার্থীদের মধ্যে তাদের মাতৃভাষার বই দেয়া হচ্ছে।
প্রাথমিক হতে স্নাতকোত্তর পর্যন্ত প্রায় কুড়ি দশমিক শূন্য-তিন (২০ দশমিক ০৩) মিলিয়ন শিক্ষার্থীর মধ্যে বৃত্তি প্রদান করা হচ্ছে। চৌদ্দ (১৪) মিলিয়ন প্রাথমিক শিক্ষার্থীর মায়েদের কাছে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে বৃত্তির টাকা পৌঁছে যায়। প্রাথমিক পর্যায়ে শতভাগ ভর্তি নিশ্চিত হয়েছে। শিক্ষার হার গত সাড়ে ৯ বছরে শতকরা ৪৫ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ৭২ দশমিক ৯ (৭২ দশমিক ৯) শতাংশে উন্নীত হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের অনন্য এবং উদ্ভাবনী আর্থ-সামাজিক পদক্ষেপসমূহ বহুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ প্রকল্পের মাধ্যমে গ্রামীণ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য ক্ষুদ্র সঞ্চয় ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। সঞ্চয়কারীগণ যে পরিমাণ টাকা জমা করেন, সরকার সমপরিমাণ অর্থ তার হিসাবে জমা করে। আমরা গৃহহীন নাগরিকমুক্ত বাংলাদেশ সৃষ্টির লক্ষ্য নিয়ে আশ্রয়ণ প্রকল্প গ্রহণ করেছি। আমরা বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রামে শহরের সুবিধাসমূহ পৌঁছে দেয়ার জন্য কাজ করে যাচ্ছি। বাংলাদেশের অভাবনীয় উন্নয়নের অন্যতম নিয়ামক হল নারীর ক্ষমতায়ন ও উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় নারীর অংশগ্রহণ। নারী শিক্ষার উন্নয়ন এবং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা অর্জনের মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়ন আমরা নিশ্চিত করছি। সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মেয়েদের দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত বিনাবেতনে লেখাপড়ার সুযোগ করে দেয়া হয়েছে। মাধ্যমিক পর্যায়ে মেয়ে ও ছেলে শিক্ষার্থীর অনুপাত ৫৩-৪৭। ২০০৯ সালের শুরুতে যা ছিল ৩৫-৬৫।
নারীর ক্ষমতায়ন প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশের সংসদই সম্ভবত বিশ্বের একমাত্র সংসদ যেখানে সংসদ নেতা, সংসদ উপনেতা, স্পিকার এবং বিরোধী দলীয় নেতা নারী। বর্তমান সংসদে ৭২ জন নির্বাচিত নারী সংসদ সদস্য রয়েছেন। তৃণমূল পর্যায়ে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের জন্য প্রতিটি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে ৩৩ শতাংশ আসন নারীর জন্য সংরক্ষিত রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, কৃষি, সেবা ও শিল্পখাতে প্রায় ২০ মিলিয়ন নারী কর্মরত রয়েছেন। বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের সর্ববৃহৎ উৎস তৈরি পোশাক খাতে প্রায় চার দশিমক পাঁচ (৪.৫) মিলিয়ন কর্মীর ৮০ শতাংশই নারী। নারী উদ্যোক্তাদের জামানত ছাড়াই ৫ শতাংশ সার্ভিস চার্জে ব্যাংক ঋণের সুবিধা দেয়া হচ্ছে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তহবিলের ১০ শতাংশ এবং শিল্প প্লটের ১০ শতাংশ নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশ বিশ্বের সর্বাধিক ঘনবসতিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। মাত্র একশ ৪৭ হাজার ৫৭০ বর্গকিলোমিটার আয়তনে ১৬০ মিলিয়নের বেশি মানুষের বসবাস। সম্পদের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও আমরা বিভিন্ন সামাজিক সূচকে প্রভূত অগ্রগতি অর্জন করেছি। মাতৃমৃত্যুর হার প্রতি ১০০ হাজারে ১৭০ এবং পাঁচ বছর বয়সের নিচে শিশুমৃত্যুর হার প্রতি হাজারে ২৮-এ হ্রাস পেয়েছে। মানুষের গড় আয়ু ২০০৯ সালের ৬৪ বছর থেকে বর্তমানে ৭২ বছরে উন্নীত হয়েছে। গত অর্থবছরে আমাদের জাতীয় বাজেটের পাঁচ দশমিক তিন-নয় (৫ দশমিক ৩৯) শতাংশ আমরা স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় করেছি। এ বছর স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ ১৭ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়েছে। প্রায় সাড়ে ১৮ হাজার কম্যুনিটি ক্লিনিক এবং ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়া হচ্ছে। ৩০ প্রকারের ঔষুধ বিনামূল্যে দেয়া হচ্ছে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ২০৩০ অনুযায়ী আমরা যক্ষা প্রতিরোধে বিভিন্ন কার্যক্রম জোরদার করেছি। যারফলে গত দুই বছরে যক্ষাজনিত মৃত্যুর হার ১৯ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
অটিজম ও জন্মগত স্নায়ুরোগে আক্রান্ত শিশুদের বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য আমরা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছি। এ বিষয়ে আমাদের কার্যক্রমকে জোরদার করতে এ সংক্রান্ত একটি সেল গঠনের প্রক্রিয়া চলছে। এছাড়া অটিজম বিষয়ক জাতীয় স্টিয়ারিং কমিটি এবং জাতীয় অ্যাডভাইজরি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটির সভাপতি এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক অ্যাডভাইজরি প্যানেলের সদস্য সায়মা ওয়াজেদ হোসেন এ সংক্রান্ত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ এশিয়ার শুভেচ্ছা দূত হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন।
আমরা জাতিসংঘের মহাসচিব কর্তৃক হাইলেভেল প্যানেল অব ডিজিটাল কোঅপারেশন প্রতিষ্ঠাকে স্বাগত জানাই। ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ ধারণার মূল দর্শন হল জনগণের কল্যাণ। ইন্টারনেটভিত্তিক সেবার ব্যাপক প্রচলনের মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ে জনগণের কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবরূপ ধারণ করেছে।
বিশ্বের ৫৭তম দেশ হিসেবে নিজস্ব স্যাটেলাইট ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১’ মহাকাশে উৎক্ষেপণের মধ্য দিয়ে আমরা মহাকাশ প্রযুক্তির জগতে প্রবেশ করেছি। বস্তুত এটি ছিল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্ন। ১৯৭৫ সালের ১৪ই জুন প্রথমবারের মত বাংলাদেশে স্যাটেলাইট ভূকেন্দ্র স্থাপন করার মাধ্যমে তিনি যে স্বপ্নের বীজ বপন করেছিলেন এই স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের মধ্য দিয়ে তা বাস্তবায়িত হয়েছে।
শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনে সর্বাধিক ঝুঁকির সম্মুখীন পৃথিবীর প্রথম দশটি দেশের একটি। ভূপ্রকৃতি এবং জনসংখ্যার আধিক্য বাংলাদেশকে বিশেষভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকির মুখে ফেলে দিয়েছে। আমরা প্যারিস চুক্তির বাস্তবায়নে অঙ্গীকারাবদ্ধ। জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিরোধে আমরা আমাদের মোট দেশজ উৎপাদনের এক শতাংশ ব্যয় করছি এবং জলবায়ু সহায়ক কৃষি ব্যবস্থা প্রবর্তন করছি। আগামী পাঁচ বছরে বৃক্ষ আচ্ছাদনের পরিমাণ ২২ শতাংশ হতে ২৪ শতাংশে উন্নীত করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ এবং ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্য- সুন্দরবন সংরক্ষণে পঞ্চাশ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়ে একটি প্রকল্প চলমান রয়েছে।
আমাদের উন্নয়ন কার্যক্রম এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় সক্ষমতা সৃষ্টিতে গৃহীত পদক্ষেপসমূহকে একীভূত করে আমরা বদ্বীপ পরিকল্পনা-২১০০ শীর্ষক মেগা প্রকল্প গ্রহণ করেছি। বাংলাদেশ বদ্বীপ পরিকল্পনা-২১০০ একটি জলকেন্দ্রিক, বহুমুখী এবং টেকনো-ইকনমিক দীর্ঘমেয়াদি একটি পরিকল্পনা। স্থানীয় ভূতাত্ত্বিক এবং বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের পেক্ষাপটে বাংলাদেশ সরকার এই পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশই পৃথিবীর একমাত্র দেশ যা কিনা দীর্ঘ ৮২ বছর মেয়াদি এই পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।
ভ্রাতৃপ্রতীম ফিলিস্তিনি জনগণের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘন আজও অব্যাহত রয়েছে যা আমাদের মর্মাহত করে। এ সমস্যার আশু নিষ্পত্তি প্রয়োজন। ওআইসি-র পররাষ্ট্র মন্ত্রীদের কাউন্সিলের সভাপতি হিসেবে আমরা ওআইসি-র মাধ্যমে ফিলিস্তিন সমস্যা সমাধানে কাজ করে যাব।
মানবসভ্যতার অগ্রগতিতে তিনটি মৌলিক উপাদান বিশেষ ভুমিকা পালন করে থাকে, তা হল – শান্তি, মানবতা ও উন্নয়ন। তাই মানবসমাজের কল্যাণে আমাদের মানবতার পক্ষে সংগ্রাম অব্যাহত রাখতে হবে। জনগণকে সেবা প্রদান এবং তাদের কল্যাণ নিশ্চিত করাই আমাদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিৎ। মানবতা ও সৌহার্দ্যই আমাদের টেকসই উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিয়ে যাবে। সমস্যা-সঙ্কুল এই পৃথিবীতে আমাদের সম্মিলিত স্বার্থ, সমন্বিত দায়িত্ব ও অংশীদারিত্বই মানব সভ্যতাকে রক্ষা করতে পারে।
বাংলাদেশের জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনে আমি নিঃস্বার্থভাবে কাজ করে যাচ্ছি। গত সাড়ে নয় বছরে আর্থ-সামাজিক বিভিন্ন খাতে বাংলাদেশ বিস্ময়কর সাফল্য অর্জন করেছে। যে বাংলাদেশকে বলা হত দুর্যোগ, বন্যা-খরা-হাড্ডিসার মানুষের দেশ, তা এখন বিশ্বশান্তি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, নারীর ক্ষমতায়ন ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে বিশ্বে চমক সৃষ্টি করেছে। বিভিন্ন সূচকে বাংলাদেশ তার দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশিদের ছাপিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে।
কিন্তু আমাদের পথচলা এখনও শেষ হয়নি। এ পথচলা ততদিন চলবে যতদিন না আমরা আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ক্ষুধা, দারিদ্র্য, নিরক্ষরতা এবং শোষণমুক্ত সোনার বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে পারব।
জাতিসংঘের ৭৩ বছরের ইতিহাসে চতুর্থ নারী হিসেবে সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায় প্রধানমন্ত্রী অধিবেশনের সভাপতি মারিয়া ফারনান্দাকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, জাতিসংঘের প্রতি আপনার অঙ্গীকার সুরক্ষায় আপনার যেকোন প্রচেষ্টায় আমার প্রতিনিধিদলের পক্ষ থেকে থাকবে অকুন্ঠ সহযোগিতা। একইসঙ্গে বিশ্বশান্তি, নিরাপত্তা ও টেকসই উন্নয়ন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সাহসী ও দৃঢ় নেতৃত্ব প্রদানের জন্য আমি জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেসকে অভিবাদন জানাই।
সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে দেয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী স্মরণ করেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। এ সময় তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, ১৫ আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যা, ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার বন্ধ রাখার বিষয়টি বিশ্বসভায় তুলে ধরেন।


ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন :

টি মন্তব্য
মন্তব্যে প্রকাশিত যেকোন কথা মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। DeshReport.com-এর সম্পাদকীয় অবস্থানের সঙ্গে এসব অভিমতের কোন মিল নেই। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নিবে না

আরো সংবাদ...

মন্তব্য করুন