লাইফষ্টাইল

ট্রলারে লখণ্ডার বিল দর্শন

  • দীপংকর দীপক 

আমাদের গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায়। এটি একটি বিলাঞ্চল। গত এক যুগ ধরে ঢাকায় থাকায় দীর্ঘদিন ধরে বিলের সৌন্দর্য্য দেখা থেকে বঞ্চিত ছিলাম। কর্মজীবনসহ নানা ব্যস্ততার কারণে এবারের ঈদের ছুটিতেও আমার গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল না। কিন্তু ঈদের সপ্তাহখানেক আগে আমার মামাতো ভাই দেবদাস দত্ত দেবু হঠাৎ করেই ফোন করল। বলল, ঈদের পরদিন তারা একটি ট্রলার ভ্রমণের আয়োজন করেছে। স্কুলজীবনের সহপাঠীদের নিয়ে লখণ্ডার বিল ঘুরে দেখবে।

লখণ্ডার বিলের কথা শুনে আমি বাড়ি যাওয়ার জন্য এক পায়ে রাজি হয়ে গেলাম। আমাদের গ্রাম তুলসী বাড়ির অদূরেই লখণ্ডার বিল। বিভিন্ন কারণে এ বিলটি সুপরিচিত। শাপলা ফুলের স্বর্গরাজ্য এটি। বর্ষাকালে প্রাকৃতিকভাবেই এখানে শাপলা ফোটে। সাদা শাপলার পাশাপাশি বেগুনি শাপলা, লাল শাপলা- সবই পাওয়া যায় এখানে। সকাল বেলা সূর্য্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই শাপলা ফুল ফুটতে শুরু করে। তখন চমৎকার এক দৃশ্যের অবতারণা ঘটে। শাপলার পাশাপাশি এ বিলের কমলি ও কচুরি ফুলের সৌন্দর্য্যও প্রকৃতিপ্রেমীদের বিমুগ্ধ করে। এখানকার সুশীতল টলমল কালো জল, নীল আকাশ আর সুশীতল বাতাস যে কাউকেই অন্য এক জগতে নিয়ে যাবে। ক্ষণিকের জন্য হলেও ভুলে যাবে শহরীয় যন্ত্রণায় কথা। আনমনা হয়ে উঠবে আবেগী মন। নিজের অজান্তেই কৈশোরসুলভ দুরন্তপনা ভর করবে। দূরের পড়ন্ত আকাশের দিকে তাকিয়ে দুই হাত মেলে দিয়ে বেহুদা চিৎকার করতে ইচ্ছে করবে। রৌদ্রদগ্ধ দুপুরে ভারি জামা খুলে শরীরে বিলের শীতল পানি ছিটিয়ে নিতে মন চাইবে। কিংবা মাছশিকারির কাছ থেকে বষ্যা (মাছ ধরার ফাঁদ) চেয়ে নিয়ে আধার দিয়ে কচুরিপানার নিচে ঢুকিয়ে মাছ ধরার জন্য অপেক্ষা করতে ইচ্ছে করবে। আর একাকী থাকলে গুনগুন সুরে মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসবে ‘নাও ছাড়িয়া দে, পাল উড়াইয়া দে’-এর মতো অসংখ্য লোকগান। বিলের মধ্য দিয়ে যাওয়া আধাডুবন্ত রাস্তার গাছের নিচে এলে নিজের মধ্যে কবি-মন বাসা বাধবে। অথবা বিল দিয়ে ছোট-ছোট নৌকাগুলো যেতে দেখলে ঠোঁট চিরে বেরিয়ে আসবে, ‘পালের নাও, পান খেয়ে যাও। ঘরে আছে ছোট্ট বোনটি তারে নিয়ে যাও।’ ঘাসফড়িং ধরা এবং শাপলা তোলার লোভ কেউ সামলাতে পারবে না। বিলের স্বচ্ছ কালো জলে ঝাঁপিয়ে পড়ে ইচ্ছে করবে বারবার। গোধূলিলগ্নে জলে ভাসমান ধাপের ওপর দাঁড়িয়ে সূর্য্যডোবার দৃশ্য দেখতে মন চাইবে। সন্ধ্যা হয়ে এলেও জলজপ্রাণীর সন্ধানে আগত শিকারি পাখিদের কিচিরমিচির শব্দে ঘরে ফেরার কথা নিশ্চিত ভুলে যাবে।

ট্রলারে ভ্রমণরত

 

পূর্বপরিকল্পনা মতো ঈদের পর দিন বৃহস্পতিবার সকাল ৯টায় ভাঙারহাট থেকে আমরা ভাড়া করা ছইবিহীন একটি ট্রলারে উঠলাম। আমরা ২০-২৫ জন ছিলাম। ট্রলারটি ভাঙারহাট-পয়সারহাট খাল দিয়ে চলতে থাকে। পরে লাটেঙ্গার বাড়ৈ বাড়ি এসে হাতের বাঁয়ে মোড় নেয়। কিছুদূর যেতেই একটি স্লুইসগেট বাধে। এই গেট দিয়ে বড়সড় ট্রলার ঢুকতে পারে না। অনেক কষ্টে আমাদের ট্রলারটি গেট অতিক্রম করে। স্লুইসগেটটি নির্মাণে পরিকল্পনার অভাব ছিল। খাল দখল করে এভাবে চিপা গেট র্নিমাণ করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ মূলত নৌ-যোগাযোগকে বিচ্ছিন্ন করতে চাইছে। তাই এ বিষয়ে এলাকাবাসীর জরুরি কোনো পদক্ষেপ নেওয়া উচিত বলে আমার মনে হয়েছে।

যা হোক, রৌদ্রস্নাত সকালে খাল দিয়ে ধীরে ধীরে আমরা এগিয়ে চললাম লখণ্ডা বিলের দিকে। কিছুদূর যেতেই খালের পাড়ে একটি বটগাছসহ কয়েকটি বড়সড় গাছ দেখতে পেলাম। এসব গাছের ডালপালা প্রায় খালের অর্ধেক স্থানকে ছায়া দিয়ে রেখেছে। সেখানে আমরা ট্রলার থামালাম। এখানে আমাদের নাস্তার আয়োজন করা হলো। আমরা রুটি আর ডিম ভাজি দিয়ে নাস্তা করলাম। এর আগে আমাদের পরিচয় পর্বটা সেরে নেওয়া হলো। কারণ, আমাদের সবার সঙ্গে প্রায় দেড়যুগ পর দেখা। তাছাড়া কে কী করে তাও ভালোভাবে জেনে নেওয়ার ইচ্ছে হলো।

ফুটবল খেলার আগে ফটোশেসন (ডান থেকে দ্বিতীয় লেখক)

ভ্রমণসঙ্গীরা হলো, ড. মধুসূদন রায় (বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা), দীপু গ্যাব্রিয়েল গাইন (প্রধান শিক্ষক), দেবদাস দত্ত দেবু (ব্যাংক কর্মকর্তা), খন্দকার হাসান হাফিজ (ইঞ্জিনিয়ার), সুশীল হালদার (ব্যাংক কর্মকর্তা), সুরেশ হালদার (ইঞ্জিনিয়ার), মুকুল ফলিয়া (গার্মেন্টস কর্মকর্তা), পলাশ ঢালী (এনজিও কর্মকর্তা), মন্মথ রায় (ইঞ্জিনিয়ার), নিক্সন রায় (ইঞ্জিনিয়ার), বিনয় বৈদ্য (প্রভাষক) ও প্রতাপ দাস (প্রভাষক)।

খাবারের মুহূর্ত

সাড়ে ১০টার দিকে আমরা আবারো ট্রলার ছাড়লাম। কিছু দূর যাওয়ার পরেই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যমণ্ডিত লখণ্ডার বিলে প্রবেশ করলাম। আমরা খাল ছেড়ে বিলে ঢুকলাম। পুরো বিলজুড়ে শাপলা পাতার আস্তারণ। সঙ্গে কচুরি-কলমি ও শ্যাওলার ছড়াছড়ি। ধীরে ধীরে ট্রলারের গতি কমে এলো। বাধ্য হয়ে ট্রলারচালকের সহকারী চহিরের (লগি) সহায়তা নিল। মুক্ত আকাশে উতপ্ত রোদ্দুরে আমরা অল্প সময়েই ঘামতে শুরু করলাম। তাতে কী সাউন্ডবক্সের সঙ্গে চলল ধুমচে নাচ। হাফিজ ভাইয়ের তিন-চার বছর বয়সী ছেলেটা ধামাকা স্টাইলে হাত-পা ছোঁড়াছুঁড়ি করে নেচে চলছিল। আমরা যারা দুর্বল তাদের কেউ কেউ অল্পতেই ক্লান্ত হয়ে আঁখ খেয়ে গলাটা ভিজিয়ে নিচ্ছিলাম। এভাবে প্রায় আধাঘণ্টা চলে গেল। কিন্তু খুব বেশি দূর এগোতে পারিনি। এবার ট্রলারের মেশিনের একঘেয়ামী ফটফট শব্দে কিছুটা বিরক্তই লাগল। হঠাৎ করেই কেউ একজন বলল, ট্রলারের ফ্যান বোধ হয় ঘুরছে না। এবার ট্রলারচালক দাঁতকেলিয়ে হাসলেন। নিজ থেকেই স্বীকার করলেন, অনেক আগেই আগাছা জড়িয়ে ট্রলারের ফ্যান বন্ধ হয়ে গেছে। বিষয়টি কাউকে বুঝতে না দেওয়ার জন্য মেশিন চালিয়ে রাখা হয়েছে। এবার শুরু হলো আমাদের বীরত্ব। চালককে ইচ্ছেমতো বকাঝকা শুরু করলাম। পরে মেশিন বন্ধ করে উতপ্ত পরিবেশকে শব্দমুক্ত করা হলো। এভাবে লগির সহায়তা নিয়েই সাড়ে ১১টার দিকে আমরা পশ্চিম লখণ্ডা উচ্চ বিদ্যালয়ের ঘাটে পৌঁছালাম।

লখণ্ডা বিলে ফুটন্ত শাপলা

আগে থেকেই বিদ্যালয় মাঠে আমাদের আরো দুই সহপাঠী সুধীর (শিক্ষক) ও লিঙ্কন অপেক্ষা করছিল। মাঠে মাদুর বিছিয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে চা খেলাম। পরে নববিবাহিত সুধীর মিষ্টি খাওয়ালো। অন্যদিকে বিদ্যালয়ের পাশের বাড়িতে রান্নাবান্নার কাজ চলতে থাকলো। দুপুর ১টার দিকে ফুটবল ম্যাচের আয়োজন করা হলো। আমরা ৯ জন করে দুই দলে ভাগ হয়ে খেলতে মাঠে নামলাম। এক ঘণ্টাব্যাপী এ ম্যাচে আমাদের পক্ষ ৪টি গোল দিয়ে বিজয়ী হয়। অপরপক্ষ দেয় ৩ গোল। খেলা শেষে বিদ্যালয়সংলগ্ন খালে আমরা প্রায় আধাঘণ্টা লাফিয়েঝাঁপিয়ে গোসল করি। বিকেল ৩টার দিকে আমরা খেতে বসি। লখণ্ডা বিলের কই, হাঁস-মুরগীর মাংসসহ একাধিক পদ দিয়ে আমরা পেট পুরে খাই। বিকেল ৫টায় আবার বিল দর্শনে বের হই। তখন পশ্চিমাকাশ ক্রমশ লাল হয়ে উঠেছিল। বাতাসের সঙ্গে ঠাণ্ডা জলীয়বাষ্প মিশে সে এক অন্য অনুভূতি তৈরি হয়েছিল। বিল দর্শন শেষে অসংখ্য সুখস্মৃতি নিয়ে রাতে পুনরায় ভাঙারহাট হয়ে আমরা বাড়ি ফিরলাম।


ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন :

টি মন্তব্য
মন্তব্যে প্রকাশিত যেকোন কথা মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। DeshReport.com-এর সম্পাদকীয় অবস্থানের সঙ্গে এসব অভিমতের কোন মিল নেই। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নিবে না

Tags

আরো সংবাদ...

মন্তব্য করুন