তথ্য প্রযুক্তি

যন্ত্রের হাসপাতাল ‘বিডি অ্যাসিস্ট্যান্ট’

রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের চায়ের দোকানে অন্য আর দশটা দিনের মতোই তুমুল আড্ডায় ব্যস্ত অনার্স প্রথম বর্ষের সাগর। বিচ্ছিন্নসব বিষয়ে আলোচনা গভীর থেকে গভীরতর হয়, ওঠে চায়ের কাপেঝড়। হঠাৎ একটু থমকে দাঁড়ায় সাগর। চা বিতরণের কাজের ব্যস্ত ছেলেটাকে বড্ড চেনা লাগছে। আড্ডা ফেলে একটু খোঁজ নিতেই জানা গেলো এই ছেলেটিই তার ছেলেবেলার বন্ধু!

এক সময়ের তুমুল মেধাবী বন্ধুটির সাথে চায়ের দোকানে এভাবে দেখা হয়ে যাবে, ভাবতেই পারেনি সাগর। নবম শ্রেণিতে থাকতে হঠাৎ বাবা মারা গেলেন, সেই থেকে সংগ্রামের শুরুবন্ধু ওমরের। পড়ালেখার পাট চুকিয়ে কখনো বাদাম বিক্রি, কখনো বাসের হেলপারের কাজ; এভাবেই ধীরলয়ে এগুচ্ছে তার জীবন। অথচ একটা সময় ছিল যখন ওমরের জীবনের স্বপ্নগুলোও ছিল রঙিন। স্বপ্ন ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়া শেষে সম্মানজনক একটা চাকরির। কিন্তু ভাগ্য সহায় না হওয়ায় সেই স্বপ্নটাও থমকে গেছে একেবারে! এখন শুধুই ছুটে চলা পেটের দায়ে।

সেদিনের সেই ঘটনাটা সাগর তো বটেই নাড়া দিয়েছে তার বন্ধু আল-আমিন, পপিসহ অনেককেই। তাদের ভাবিয়ে তুলেছে, কিছুই কি করার নেই ভাগ্যের যাতাকলে পিষ্ট হওয়া এমন মেধাবী তরুণদের জন্য। খানিকটা ভালো জীবন তো তাদেরও প্রাপ্য। যেই ভাবা সেই কাজ। এই ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের কারিগরি দক্ষতায় দক্ষ করে হোক প্রতিষ্ঠা ওয়ানস্টপ সার্ভিসিং কোম্পানি, যেখানে তারাই সার্ভিসিং অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ করবে।

শুরুটা রংপুর থেকেই। নিজ শহরে বিভিন্ন ইলেক্ট্রনিক্স যন্ত্রপাতি সার্ভিসিং এর জন্য দক্ষ টেকনিশিয়ানের যথেষ্ট অভাব ছিল, ছিলোনা ভালো কোন সার্ভিসিং সেন্টারও। শহরবাসীকে সার্ভিসিং কাজে নানামুখী ভোগান্তি আর প্রতারণা থেকে বাঁচাতে ২০১৮ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর শুরু হয় ‘বিডি অ্যাসিস্ট্যান্ট’। উদ্যোক্তা আবু সাঈদ আল সাগর, মো. আল-আমিন ইসলাম ও উম্মে কুলসুম পপি।

শহরতলিরমানুষকে বাসাবাড়ি কিংবা অফিসের যেকোনো সার্ভিস যেমন- ইলেক্ট্রনিক্স পণ্যের সার্ভিসিং, ইলেকট্রিক্যাল সার্ভিসিংসহ যেকোনো ধরনের মিস্ত্রী কিংবা টেকনিশিয়ান কেন্দ্রিক সেবা দিয়ে জনপ্রিয় হতে শুরু করলো বিডি অ্যাসিসটেন্ট।

মানুষের চিকিৎসার জন্য রয়েছে হাসপাতাল বা ক্লিনিক,পশুদের চিকিৎসার জন্য পশু হাসপাতাল। কিন্তু নিত্য প্রয়োজনীয় ইলেক্ট্রনিক্স পণ্যের জন্য এরকম কোন গোছালো সেবা নেই। বিডি অ্যাসিস্ট্যান্টই হল সেই যন্ত্রপাতিরহাসপাতাল বা সার্ভিসিং হসপিটাল। এখন পর্যন্ত প্রায় ৫০০ মানুষকে সেবা দিয়েছে তারা।

কাজের সুযোগ করে দিয়েছে অন্তত ৪০ জন সার্ভিসিং অ্যাসিস্ট্যান্টকে। বডি অ্যাসিস্ট্যান্ট বর্তমানে ৪টি ক্যাটেগরিতে ২০ ধরনের সার্ভিস দিচ্ছে। বাসায় বসেই রংপুরবাসী একটিমাত্র ফোনকল করে কিংবা বিডি অ্যাসিস্ট্যান্টের ওয়েবসাইট (www.bdassistant.com)অথবা ফেইসবুক পেইজে (www.facebook.com/bdassistant) যোগাযোগ করে সহজেই সেবাগুলো নিতে পারছেন।

তবে পরিকল্পনাকেবাস্তবেরূপ দিতে উদ্যোক্তাদের কঠিন সময় ও চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে। সহপ্রতিষ্ঠাতা আল-আমিন ইসলাম বলেন, যদিও ২০১৫ সাল থেকে আমরা পরিকল্পনাটির বাস্তবায়ন নিয়ে কাজ করার প্রচেষ্টা চালিয়েছি, কিন্তু মূলধনের অভাবে আমরা এগোতে পারিনি। তবে এসময় আমরা দেশে অনেকগুলো বিজনেস আইডিয়া কন্টেস্টে অংশগ্রহণ করি। কয়েকটিতে আমরা সাফল্যও অর্জন করি। যেমন- বাংলাদেশ ব্র্যান্ড ফোরাম আয়োজিত ‘ইউথফেস্ট ২০১৬’-তে জাতীয় পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন হয়ে সিঙ্গাপুর ভ্রমনের সুযোগ পাই।

আরেক সহ-প্রতিষ্ঠাতা আবু সায়েদ আল সাগর বলেন, তবে ২০১৬ সালে ব্র্যাকের আরবান ইনোভেশন চ্যালেঞ্জ ছিলো একটি বড় টার্নিং পয়েন্ট। এই প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে ৫ লাখ টাকা সীড ফান্ড সহ ৬ মাসের ইনকিউবেশন সাপোর্ট পাই। পরবর্তীতে তারাই ইনভেস্টমেন্টের জন্য বিভিন্ন ইনভেস্টর প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রেজেন্টেশনের ব্যবস্থা করে দেয়। এর ফলে ব্র্যাক থেকেই আমরা পরবর্তীতে ভালো অঙ্কের একটি ইনভেস্টমেন্ট পাই। এক কথায়, বিডি অ্যাসিস্ট্যান্টকে বাস্তবে রূপ দিতে আরবান ইনোভেশন চ্যালেঞ্জের অবদান অনস্বীকার্য।

ভবিষ্যৎ সম্পর্কে জানতে চাইলে বিডি অ্যাসিস্ট্যান্টের আরেক সহ-প্রতিষ্ঠাতা উম্মে কুলসুম পপি বলেন, পাঁচ বছরের মধ্যে আমরা উত্তরবঙ্গের সকল জেলাসহ দেশের ৩০টি জেলায় আমাদের কার্যক্রম সম্প্রসারিত করতে চাই। আর ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের প্রতিটি ঘরের সার্ভিসিং কাজের জন্য একটি বিশ্বস্ত অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে বিডি অ্যাসিস্ট্যান্টকে সবার কাছে পৌঁছে দিতে চাই। পাশাপাশি অন্তত ২% মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক থেকে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীকে আমাদের কার্যক্রমের সাথেকরতে চাই।

আপনিও হতে পারেন সাগর, আল-আমিন কিংবা পপির মত একজন। আপনার স্বপ্নটিও সত্যি হয়ে ছড়াতে পারে আশার আলো। সাগর-পপিদের চিনে নিয়েছিলো ব্র্যাকের আরবান ইনোভেশন চ্যালেঞ্জ। আরো একবার শুরু হয়ে গেছে এই চিনে নেয়ার পালা। আপনার যেকোনো উদ্যোগকে ঘিরে আপনিও আবেদন করতে পারেন uic.brac.net এই ওয়েবসাইটটিতে। আবেদনের শেষ তারিখ ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮। সংবাদ বিজ্ঞপ্তি


ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন :

টি মন্তব্য
মন্তব্যে প্রকাশিত যেকোন কথা মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। DeshReport.com-এর সম্পাদকীয় অবস্থানের সঙ্গে এসব অভিমতের কোন মিল নেই। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নিবে না

Tags

আরো সংবাদ...

মন্তব্য করুন