স্বাস্থ্য

সারাদেশে ধূমপানবিরোধী প্রকল্প প্রস্তাব বাস্তবায়ন হবে: কামাল

সারাদেশে ধূমপানের ক্ষতি সম্পর্কে সচেতনতামূলক প্রচারনা চালাতে কেউ প্রকল্প প্রস্তাব নিয়ে পরিকল্পনা কমিশনে গেলে তা বাস্তবায়নের আশ্বাস দিয়েছেন পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল।

বুধবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে আয়োজিত ‘ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন টোব্যাকো কন্ট্রোল (এফসিটিসি) আর্টিক্যাল ৫.৩ বাস্তবায়ন বিষয়ে গবেষণার ফল প্রকাশ’ শীর্ষক অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ আশ্বাস দেন।

পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, “আগামী ২০৪০ সালের মধ্যে দেশকে একটি উন্নত দেশে উন্নীত করতে হলে দেশের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু তামাক দেশের মানুষ ও সমাজকে ক্ষতির মুখে ফেলছে। তাই দেশের টেকসই উন্নয়নের জন্য ক্ষতিকর তামাক বন্ধে একটি কার্যকর কৌশল গ্রহণ করতে হবে।”

তিনি বলেন, “দেশে তামাক পণ্যের ওপর বেশি করারোপ করছে সরকার। কিন্তু বিদেশে আমাদের চেয়ে বেশি পরিমাণে কর বসানো হচ্ছে। যার ফলে তামাক কোম্পানিগুলো এখন বাংলাদেশে ব্যবসা করায় আগ্রহী হয়ে উঠেছে।”

তামাকপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির বিষয়ে আগামী বাজেটে ‘অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় রাজস্ব পদক্ষেপ’ নেওয়ার আশ্বাসও দেন তিনি।

মন্ত্রী বলেন, “জনগণকে তামাকে নিরুৎসাহিত করতে এর ক্ষতি সম্পর্কে প্রচার চালাতে হবে। জনগণকে সম্পৃক্ত করে এ প্রচারণা চালাতে হবে।

“ধূমপানবিরোধী প্রচারণা চালানোর জন্য কেউ পরিকল্পনা কমিশনে প্রকল্প নিয়ে আসলে পরিকল্পনা কমিশনও অংশগ্রহণমূলক ভিত্তিক ওই প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে।”

অনুষ্ঠানে সংসদ সদস্য সাবের হোসেন চৌধুরী বলেন, “জাপানি কোম্পানি বাংলাদেশে প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকার একটি বিনিয়োগ প্রস্তাব নিয়ে এসেছে। যা দুঃখজনক। অথচ ওই কোম্পানি ভারতে বিনিয়োগ চেষ্টা করেছিল। তাতে সফল না হওয়ায় তারা বাংলাদেশে এসেছে।”

এধরনের বিনিয়োগ নিষিদ্ধ করা উচিত জানিয়ে তিনি বলেন, “বহুজাতিক তামাক কোম্পানি ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকোতে সরকারের ১০.৮৫ শতাংশ শেয়ার আছে আর এই শেয়ারের বিপরীতে ১১ জন পরিচালকের মধ্যে ৬ জনই বর্তমান ও সাবেক সরকারি কর্মকর্তা, যা থাকার কথা একজন।

“আর এই ভারসাম্যহীন অবস্থার কারণেই তামাকের জন্য বিদেশি বিনিয়োগ করতে সুযোগ পায়। তামাক কোম্পানিগুলো বেপরোয়া হয়ে উঠে।”

অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক আবুল কালাম আজাদ বলেন, “আমরা এফসিটিসি বাস্তবায়নে কেবল সমর্থনই করে যেতে চাই না, সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণও করতে চাই। এ ব্যাপারে আগের তুলনায় আমরা আরো বেশি শক্তিশালী অবস্থানে আছি।”

তিনি বলেন, “এফসিটিসি বাস্তবায়নের ব্যাপারে যেখানে প্রধানমন্ত্রী তার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন, সেখানে রাষ্ট্রযন্ত্রের কাজই হচ্ছে তা বাস্তবায়ন করা।”

অনুষ্ঠানের সভাপতির বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, “তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার জন্য পাঠ্যপুস্তকেই ধূমপানের ক্ষতিকর বিষয়গুলো নিয়ে ছাত্রদের শিক্ষা দেওয়া উচিত। পাঠ্য পুস্তকে ধূমপানের ক্ষতির বিষয়টি নিয়ে আসতে হবে।”

অনুষ্ঠানে গবেষণার ফলাফল তুলে ধরে প্রজ্ঞার সমন্বয়ক হাসান শাহরিয়ার বলেন, সরকারের তামাকবিরোধী নানা কার্যক্রমের ফলে ২০০৯ সালের তুলনায় ২০১৭ সালে তামাকের ব্যবহার ১৮.৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।

গ্লোবাল অ্যাডাল্ট টোব্যাকো সার্ভে- গ্যাটস ২০১৭ অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১৫ বছরের ঊর্ধ্বে তামাক ব্যবহারকারীর হার ৩৫.৩ শতাংশ অর্থ্যাৎ ৩ কোটি ৭৮ লাখ তামাকে আসক্ত।

গবেষণার ফলাফলের পরিপ্রেক্ষিতে শাহরিয়ার বলেন, “২০০৯ সালে পরিচালিত প্রথম গ্যাটস জরিপে তামাক ব্যবহারকারীর এই হার ছিল ৪৩.৩% বা ৪ কোটি ১৩ লাখ।”

তামাক কোম্পানির ‘বিদ্যমান হস্তক্ষেপ’ অব্যাহত থাকলে ২০৪০ সালের মধ্যে তামাকমুক্ত বাংলাদেশ অর্জন পিছিয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

“বাংলাদেশ ২০০৮ সালে এফসিটিসি আর্টিক্যাল ৫.৩ সংক্রান্ত গাইডলাইন গ্রহণ করলেও, এক দশক সময় অতিক্রান্ত হলেও এ সংক্রান্ত কোনো নীতিমালা প্রণয়ন করেনি।”

নীতিমালা অনুসারে তামাক কোম্পানির হস্তক্ষেপমুক্ত থাকতে সরকার বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ ও বাস্তবায়নে অঙ্গীকারবদ্ধ বলে জানান তিনি।

গবেষণার ফলাফলে আরও বলা হয়, তামাক কর নীতি প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় তামাক কোম্পানির অংশগ্রহণ পরিলক্ষিত হয়েছে। যেমন, জাতীয় বাজেট তৈরির সময় তামাকপণ্যে করারোপের ক্ষেত্রে তামাক কোম্পানিগুলোর সাথে বৈঠক করা হয়েছে। এরপরেই দেখা যায়, ২০১৭-১৮ অর্থবছরের চূড়ান্ত বাজেটে বিড়ির ওপর প্রস্তাবিত সম্পূরক শুল্ক ৩৫% থেকে কমিয়ে ৩০% নির্ধারণ করা হয়েছে। তামাক কোম্পানির সুপারিশ অনুযায়ী হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়।

বিভিন্ন সময় তামাক কোম্পানিকে নানাভাবে সুবিধা প্রদানের নজির পাওয়ার দাবি করে গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, “প্যাকেটের মোড়কের উপরে ৫০ শতাংশ স্বাস্থ্য স্বচিত্র সতর্কবাণী প্রকাশের নির্দেশনা থাকলেও সরকার বিশেষ ব্যবস্থায় নিচের অংশে মুদ্রণের অনুমতি প্রদান, রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে অবস্থিত কোম্পানিকে তামাকজাত পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে আরোপিত ২৫% শুল্ক প্রদান থেকে অব্যাহতি প্রদান উল্লেখযোগ্য।”

তামাক কোম্পানি বা এর প্রতিনিধি ও বিভিন্ন পর্যায়ে সরকারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকের বিষয়ে কখনই স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হয়নি বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।

“অথচ স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণে তামাক কোম্পানি, তামাক কোম্পানির সহযোগী সংস্থা এবং পক্ষভুক্ত লবিস্টদের পরিচয় প্রকাশ অথবা নিবন্ধন গ্রহণ অত্যাবশ্যক।”

গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তামাকমুক্ত বাংলাদেশ অর্জনে তামাক কোম্পানির হস্তক্ষেপ বড় বাধা হিসেবে কাজ করার কারণে সামগ্রিকভাবে, আর্টিক্যাল ৫.৩ এর নির্দেশনাবলী বাস্তবায়নে অগ্রগতি সন্তোষজনক নয়।

আর্টিক্যাল ৫.৩ অনুযায়ী- তামাকের বিরুদ্ধে কোনও প্রকার বিধি নিষেধ আরোপ করতে গেলে সরকার কোনও তামাক কোম্পানির সহযোগিতা নেবে না।

“এক্ষেত্রে তামাক কোম্পানির হস্তক্ষেপ সূচকে এশিয়ার দশটি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান তুলনামূলকভাবে খারাপ (নবম)।”

অন্যান্য দেশগুলোর অবস্থান যথাক্রমে, ব্রুনেই (১ম), ফিলিপাইন (২য়), থাইল্যান্ড (৩য়), কম্বোডিয়া (৪র্থ), মালয়েশিয়া (৫ম), লাউস পিডিআর (৬ষ্ঠ), মিয়ানমার (৭ম), ভিয়েতনাম (৮ম) এবং ইন্দোনেশিয়া (১০ম)।

এটিএন বাংলার প্রধান প্রতিবেদক ও অ্যান্টি টোব্যাকো মিডিয়া অ্যালায়েন্স- আত্মা’র কো-কনভেনর নাদিরা কিরণের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ক্যাম্পেইন ফর টোব্যাকো ফ্রি কিডস (সিটিএফকে) গ্রান্টস ম্যানেজার ডা. মাহফুজুর রহমান ভুঁঞা, বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার ন্যাশনাল প্রফেশনাল অফিসার ডা. সৈয়দ মাহফুজুল হকসহ জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেল এবং তামাকবিরোধী সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিরা।

বেসরকারি সংস্থা প্রজ্ঞা এবং অ্যান্টি টোবাকো মিডিয়া অ্যালায়েন্স- আত্মা যৌথভাবে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

 

দেশরির্পোট/রবিন


ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন :

টি মন্তব্য
মন্তব্যে প্রকাশিত যেকোন কথা মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। DeshReport.com-এর সম্পাদকীয় অবস্থানের সঙ্গে এসব অভিমতের কোন মিল নেই। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নিবে না

আরো সংবাদ...

মন্তব্য করুন