অর্থনীতি

নির্বাচনের কারণে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হতে পারে-বিশ্ব ব্যাংক

চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরে সরকার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, তা অর্জন হবে না বলে মনে করছে বিশ্ব ব্যাংক। বিশ্ব ব্যাংক বলছে চলতি অর্থবছর শেষে মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি প্রবৃদ্ধি হবে ৭ শতাংশ। আর সরকারের লক্ষ্যমাত্রা হচ্ছে ৭ দশমিক ৮ শতাংশ।

বিশ্ব ব্যাংকের মতে, অভ্যন্তরীণ চাহিদা, বেসরকারি বিনিয়োগ, রেমিট্যান্স ও রফতানিতে ইতিবাচক ধারা ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনে সহযোগিতা করবে। তবে এ বছর জাতীয় সংসদ নির্বাচন থাকায় অর্থনৈতিক সুশাসন দুর্বল হতে পারে। বাধাগ্রস্ত হতে পারে বিনিয়োগ।

মঙ্গলবার বিশ্ব ব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ে অর্থনীতির সর্বশেষ পরিস্থিতি নিয়ে ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ নামে এক প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদনটির বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন সংস্থাটির লিড ইকোনোমিস্ট জাহিদ হোসেন। এ সময় ঢাকা অফিসের কান্ট্রি ডিরেক্টর চিমিয়াও ফানসহ অন্যান্য কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানে প্রতিবেদনটির ওপর পর্যালোচনা করেন পিপিআরসির চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান ও পিআরআইয়ের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর।

আসন্ন নির্বাচনকে অর্থনীতির অন্যতম অভ্যন্তরীণ ঝুঁকি উল্লেখ করে বিশ্ব ব্যাংক বলেছে, এতে সুশাসন, উন্নয়নের চলমান কার্যক্রম দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। এতে বেসরকারি বিনিয়োগ ও আস্থা বাধাগ্রস্থ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। খেলাপি ঋণও বাড়তে পারে। যা প্রবৃদ্ধিকে ধীর করে ফেলবে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও কাঠামোগত পরিবর্তনের ফলে প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা থাকবে। তবে এক্ষেত্রে আত্মতুষ্টিতে ভোগার অবকাশ নেই। প্রবৃদ্ধির উচ্চাকাঙ্খা অর্জন করতে হলে বাংলাদেশকে বেসরকারি খাত চাঙ্গা করার মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। রফতানি বহুমুখীকরণ ও মানব সম্পদ উন্নয়নও জরুরি। পাশাপাশি ব্যবসা করার নিয়ম কানুন সহজ করতে হবে। বড় বড় প্রকল্পগুলো সময়মত বাস্তবায়ন করতে হবে। আর্থিক খাতের সুশাসনে উন্নতি এবং গ্রহণযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ জরুরী। রফতানি ও রেমিট্যান্সে টেকসই প্রবৃদ্ধি গুরুত্বপূর্ন। একইসাথে অবকাঠামো উন্নয়ন, নগর ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশকে ক্ষতির হার থেকে রক্ষা করার কার্যক্রমেও গুরুত্ব দিতে হবে।

চিমিয়াও ফান বলেন, উল্লেখযোগ্য হারে দারিদ্র বিমোচন ও নাগরিকদের জন্য সুযোগ সৃষ্টিতে বাংলাদেশ পরিচিতি পেয়েছে। বর্তমানে দ্রুত প্রবৃদ্ধি হচ্ছে বিশ্বের এমন ১০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ রয়েছে। বাংলাদেশের যে অগ্রগতি হচ্ছে তা ধরে রাখতে উদ্যোক্তা উন্নয়ন, উদ্ভাবন ও কাঠামোগত পরিবর্তন দরকার। একইসাথে বাংলাদেশকে শিক্ষা, দক্ষতা, পুষ্টি এবং বৈশ্বিক চাহিদার সাথে খাপ খাইয়ে পরিবর্তনযোগ্য প্রযুক্তির উন্নয়ন করতে হবে।

জাহিদ হোসেন বলেন, সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনা আরও উন্নত হওয়া দরকার। বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভর্তূকি ব্যয়ে সরকারকে আরও চতুর হতে হবে। যে যুক্তিতে ও লক্ষ্যে ভর্তূকি দেওয়া হচ্ছে বাস্তবে তা হচ্ছে কি-না দেখতে হবে।

তিনি আরও বলেন, সময়মত প্রকল্প শেষ করতে না পারার কারণে ব্যয় বাড়ছে। এজন্য প্রকল্প প্রনয়নের আগে জমি অধিগ্রহণের জটিলতা দূর করে নেয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

তিনি বলেন, রফতানি বহুমুখীকরণ বড় চ্যালেঞ্জ। তবে তৈরি পোশাক খাতের মধ্যেই বহুমূখীকরণের অনেক সুযোগ রয়েছে, সেই সুযোগ নিতে হবে। বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য ওয়ান স্টপ সার্ভিস আইন যথাযথ বাস্তবায়ন, এনবিআরের সিঙ্গেল উইন্ডো কার্যকর, বন্দর ব্যবস্থায় দক্ষতা বাড়ানো, বিদ্যুত খাতে অপচয় কমিয়ে আনতে হবে। বাংলাদেশকে উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশ হতে হলে এখনই অর্থনৈতিক ভিত্তিগুলো ঠিক করতে হবে। দ্রুতই মূল্যষ্ম্ফীতি, যথাযথ বিনিময় হার ও সুদ হারের বিকৃতি দূর করার বিষয়ে নীতি গ্রহণ করতে হবে।

পিপিআরসির চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, প্রবৃদ্ধির সংখ্যাতাত্ত্বিক বিতর্কের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে যে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে তা টেকসই কি-না, সবাইকে নিয়ে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে কি না, বর্তমান প্রবৃদ্ধির সুফল কোথায় যাচ্ছে তা দেখা। ধামাধরা পুঁজিবাদ সৃষ্টি হচ্ছে কি-না দেখতে হবে। দেশে এখনও ৩ কোটি ৯০ লাখ দরিদ্র, ১ কোটি ৯০ লাখ অতি দরিদ্র। ১৫ দশমিক ২০ ভাগ মানুষ অপুষ্টিতে ভুগছে। এজন্য সকলকে উন্নয়নে সম্পৃক্ত করা জরুরি।

তিনি বলেন, বেকারত্ব কম যেমন ঠিক আছে, তেমনি ছায়া বেকারত্ব রয়েছে তা চিন্তার বিষয়। এদিকে সরকারি বিনিয়োগ বাড়ছে। কিন্তু সেই বিনিয়োগ কোথায় কিভাবে হচ্ছে দেখা দরকার। একাধিক প্রকল্প হচ্ছে না এক প্রকল্পেই ব্যাপক ও অতিমূল্যায়িত বিনিয়োগ হচ্ছে সেগুলো এখন ভাবার সময়। এজন্য রাজনৈতিক দক্ষতা বড় বিষয়। রাজনৈতিক সুশাসন ছাড়া টেকসই উন্নয়ন হবে না।

পিআরআই নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, জিডিপি প্রবৃদ্ধির তুলনায় রফতানি ও রেমিট্যান্সে প্রবৃদ্ধি কম। বেসরকারি বিনিয়োগে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। আমদানি হচ্ছে, কিন্তু তা বিদেশী অর্থায়নে। চলতি হিসাব নেতিবাচক হয়ে গেছে। এসবই চ্যালেঞ্জ। সুদ হারও স্থিতিশীল নয়। সরকার যে নয়-ছয় ব্যবস্থা করেছে তা মুখে মুখে কার্যকর বলা হলেও বাস্তবে হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের এই নীতি থেকে ধীরে ধীরে সরে যাওয়া উচিত। তবে মূল্যষ্ম্ফীতি কম হবে, এটা স্বস্তির খবর।

তিনি বলেন, টাকার মূল্য কমিয়ে রফতানি আয় বাড়ানোর যে চেষ্টা করা হয়েছে তা হয়নি। আবার আমদানি ব্যয় বেড়েছে। এজন্য বিনিময় হার বাজারমুখী হওয়া উচিত। সরকারের উচিত অভ্যন্তরীণ সম্পদ থেকে চাহিদা মেটানোর চেষ্টা করা। কারণ ১০ শতাংশ কর জিডিপি অনুপাত দিয়ে উন্নয়নশীল দেশ হওয়া যাবে না।

সামগ্রিক অর্থনীতিতে চাপ: বিশ্ব ব্যাংক বলছে, সাম্প্রতিক খাদ্য বহির্ভূত মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়া অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করবে। এছাড়া বৈদেশিক উৎস থেকে অর্থায়নের ঘাটতি, তারল্য সংকট ও রাজস্ব ঘাটতিও চাপের কারণ হবে। অর্থনীতির অন্যতম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে, প্রধান প্রধান রফতানি বাজারে চাহিদার ধীর গতি ও অর্থনৈতিক সুশাসন উন্নয়নের উদ্যোগগুলোর দূর্বলতা। এছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের উচ্চ মাত্রার খেলাপি ঋণ এবং রোহিঙ্গা পরিস্থিতি অর্থনীতিতে নতুন চাপ সৃষ্টি করবে। বিশ্বব্যাংক বলছে নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ঝুঁকিগুলোর বিরুদ্ধে সবচেয়ে ভালো প্রতিরোধক।

খেলাপি ঋণ প্রসঙ্গ: বিশ্ব ব্যাংক বলছে, আর্থিক তথা ব্যাংক খাতের সুশাসনে অন্যতম বাধা খেলাপি ঋণ। গত জুন শেষে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১০ দশমিক ৪ শতাংশে। ছয়টি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকেই মোট খেলাপি ঋণের ৪৮ শতাংশ। ৪০টি বেসরকারি ব্যাংকে খেলাপি ঋণের ৪৪ শতাংশ রয়েছে। এভাবে খেলাপি ঋণ বাড়লে বাজেটে চাপ বাড়বে। এজন্য আর্থিক খাতে সংস্কার জরুরী। রাজনৈতিক সুশাসনের অভাবেই খেলাপি ঋণ কমছে না।

প্রসঙ্গ পদ্মা সেতু: হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, পদ্মা সেতু সরকার নিজস্ব অর্থায়নে করলেও পদ্মায় যে রেল সেতু করা হচ্ছে তা পুরো অর্থায়নই বিদেশী ঋণে হবে। এই রেল সেতু করতে ৪০ থেকে ৫০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের যৌক্তিকতা কোথায় তা দেখা দরকার। এই সেতুর অর্থনৈতিক সুফল কি তা স্পষ্ট নয়। সরকারের এসব বিষয় স্পষ্ট করা উচিত।

ঋণের ফাঁদে পড়তে পারে দেশ: বক্তারা বলেন, বাংলাদেশ এখন ঝুঁকিপূর্ণ অর্থায়নের ঝুঁকিতে রয়েছে। কারণ বড় বড় সকল প্রকল্প বিদেশী অর্থায়নে করা হচ্ছে। এতে ভবিষ্যতে বিদেশী ঋণের ফাঁদে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। প্রকল্পের ব্যয় এবং তার রিটার্ন কি এসব স্পষ্ট নয়। এটা একটা বড় চ্যালেঞ্জ।

বিদ্যুৎ খাত: বিশ্বব্যাংক বলছে, অর্থনৈতিক চাহিদা মেটাতে বিদ্যুৎ খাতের সম্প্রসারণ প্রয়োজন। যদিও সাম্প্রতিক কয়েক বছরে এ খাত অনেক এগিয়েছে। ২০০৯ সালে যেখানে ৪৭ ভাগ মানুষ বিদ্যুতের আওতায় ছিল ২০১৭ সালে তা ৮০ ভাগে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু ২০৩০ সালে বিদ্যুতের চাহিদা দাড়াবে ৩৪ গিগাওয়াট, যা বর্তমানের তুলনায় দ্বিগুন। এই চাহিদা মেটাতে বিদ্যুৎ খাতে ব্যাপক সংস্কার দরকার। এরমধ্যে বিদ্যুৎ সরবরাহের বিভিন্ন ধাপে দক্ষতা উন্নয়ন ও আমদানি জ্বালানি নির্ভরতা দূর অন্যতম।

দাম ও গ্যাসের ব্যবহার নিয়েও ভাবনার প্রস্তাব করেছে সংস্থাটি। বিশ্বব্যাংক বলছে, দক্ষ ব্যবস্থাপনা হলে ৮ শতাংশ গ্যাস সাশ্রয় সম্ভব, যা ১৫ শতাংশ বিদুৎ ঘাটতি মেটাবে। বিদ্যুতের দাম নির্ধারণ হতে হবে কস্ট বেজড প্রাইসিং মেকানিজমে। লোড ম্যানেজমেন্ট ঠিকমত করা গেলে বছরে ১৬৫ কোটি ডলার তেল খরচ কমানো সম্ভব।

 

 

দেশরির্পোট/আরেফিন


ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন :

টি মন্তব্য
মন্তব্যে প্রকাশিত যেকোন কথা মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। DeshReport.com-এর সম্পাদকীয় অবস্থানের সঙ্গে এসব অভিমতের কোন মিল নেই। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নিবে না

আরো সংবাদ...

মন্তব্য করুন