অর্থনীতি

বিদেশি ঋণনির্ভর প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে ভবিষ্যতের ঋণ সংকট তৈরি হতে পারে

মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে অতিমাত্রায় বিদেশি ঋণ নির্ভরতা দেশের অর্থনীতির জন্য সংকট হয়ে দাঁড়াতে পারে এমন আশঙ্কা করেছেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর এবং পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান। তাদের উভয়ের মতে, বড় আকারের বিদেশি ঋণনির্ভর প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে ভবিষ্যতের ঋণ সংকট তৈরি হতে পারে। এজন্য মেগা প্রকল্পে সরকারি ব্যয়ের অংশ বাড়াতে হবে। সেইসঙ্গে এসব প্রকল্পের মাধ্যমে অর্থনৈতিক সুফল কতটা পাওয়া যাবে সে বিষয়টিও দেখতে হবে। বড় আকারের ঋণ শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তানের মতো ‘ডেবট ট্রাপ’ বা ঋণের ফাঁদ যেন তৈরি না করে সে বিষয়ে সতর্ক করেন তারা।
গতকাল বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসে বাংলাদেশের হালনাগাদ উন্নয়ন প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্যানেল আলোচনায় তারা এ কথা বলেন। অনুষ্ঠানে এ বিষয়ে দ্বিমত প্রকাশ করে বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর চিমিয়াও ফান। তিনি বলেন, বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ এখন জিডিপির হিসাবে ৪ শতাংশের মতো। এটা সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে। তা ছাড়া ঋণ গ্রহণ ও পরিশোধ এখনও সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে। ডেবট ট্রাপের পর্যায়ে যায়নি বাংলাদেশ।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের অর্থনীতির হালনাগাদ প্রতিবেদনটি তুলে ধরেন বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন। প্রবৃদ্ধি বেগবান করতে মেগা প্রকল্পগুলো সময়মতো বাস্তবায়নের প্রতি গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
প্যানেল আলোচনায় অংশ নিয়ে ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, সরকারের গৃহীত বিভিন্ন মেগা প্রকল্পে গুণগত মান ও খরচ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে এসব মেগা প্রকল্প থেকে কী ধরনের অর্থনৈতিক সুফল আসবে, তা নিয়ে চূড়ান্ত কোনো হিসাব এখনও করা হয়নি। অথচ এসব মেগা প্রকল্পে যেভাবে ব্যয় বাড়ছে তা কতটা যৌক্তিক তা ভেবে দেখতে হবে। তিনি বলেন, পদ্মা সেতু প্রকল্পের ব্যয় ৪০-৫০ হাজার কোটি টাকায় চলে যেতে পারে। মেগা প্রকল্পের প্রায় পুরোটাই ঋণনির্ভর। এখানে সরকারের ব্যয়ের অংশ বাড়াতে হবে। আমাদের সামনে শ্রীলঙ্কার মতো উদাহরণ রয়েছে যারা অতিমাত্রায় বিদেশি ঋণ নিয়ে ফাঁদে আটকে গেছে।
হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, আমরা পদ্মা সেতু নিজেদের অর্থায়নে করছি। বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে যে ঋণ পাওয়ার কথা ছিল সেটি অভ্যন্তরীণ উত্স থেকে ঋণ নিয়ে খরচ করছি। অন্যদিকে পদ্মা সেতুর রেল সংযোগ প্রকল্প বিদেশি ঋণে করছি। এ ধরনের মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে আমরা যেন ভবিষ্যতে মালয়েশিয়া, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কার মতো ‘ডেবট ট্রাপে’ না পড়ে যাই সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।
বাংলাদেশের হালনাগাদ পূর্বাভাস প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংক বলেছে, অভ্যন্তরীণ চাহিদা বৃদ্ধি, বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং রপ্তানি ও রেমিট্যান্সের ইতিবাচক ধারা বজায় থাকলে চলতি অর্থবছর প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশ হতে পারে। এদিকে সরকারি হিসাবে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ৮ শতাংশের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে আহসান এইচ মনসুর বলেন, জিডিপির প্রবৃদ্ধির সরকারি হিসাবে ৭.৮ শতাংশ নির্ধারণ করেছে। এটা নিয়ে কিছু প্রশ্ন রয়েছে, এখানে অনেক দুর্বলতা রয়েছে। গত কয়েক বছরে রপ্তানি আয় হতাশাজনক। জিডিপির তুলনায় রপ্তানি প্রবৃদ্ধি কম হলে কীভাবে প্রবৃদ্ধি বাড়বে? তিনি বলেন, চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে রেমিট্যান্স কমছে, অথচ বিদেশে কর্মসংস্থান বেড়েছে। তাহলে টাকা কোথায় গেলো। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়ছে না। জিডিপির এই প্রবৃদ্ধি টেকসই কি না সেটি নিয়ে আমাদের উদ্বেগ বাড়ছে। তিনি বলেন, চলতি হিসাবের ঘাটতি বেড়ে যাচ্ছে। এজন্য রিজার্ভকে মনিটর করতে হবে। তিনি বলেন, সুদের হার নিয়ে ব্যাংকের নয়-ছয় পলিসি নির্ধারণ কোনো কাজে আসেনি। সিঙ্গেল ডিজিটে নেমে আসেনি ব্যাংকের সুদের হার। আর এটা সম্ভবও না। তাই সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংককে এ অবস্থান থেকে সরে আসতে হবে।
হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, প্রবৃদ্ধি টেকসই হবে কিনা সে বিষয় ভেবে দেখতে হবে। কেননা বাংলাদেশে এখনো তিন কোটি ৯০ লাখ মানুষ দরিদ্র। ৫৫ লাখ শিশু খর্বকায়। অপুষ্টি এখনও বড় সমস্যা। এদেশে এখন এমএ পাস করা ছাত্র পিয়নের চাকরি করছে। তাহলে এ প্রবৃদ্ধি কার কাছে যাচ্ছে?। তিনি বলেন, আমাদের প্রবৃদ্ধির হার নিয়েও বিতর্ক রয়েছে।
জিডিপির হার নিয়ে প্রশ্ন করা হলে বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর চিমিয়াও ফান বলেন, প্রবৃদ্ধি কতটা হলো সেই সংখ্যার চেয়ে প্রবৃদ্ধির গুণগত মানের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে হবে। ৭ শতাংশের উপরে যেতে পারবে কি না এমন প্রশ্নে আমি বলবো সেটি সম্ভব। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সংস্কারের মাধ্যমেই এই অর্জন সম্ভব। তবে আমাদের দেখতে হবে এই প্রবৃদ্ধির ফলে সাধারণ মানুষের জীবন মানের কী পরিবর্তন হলো। আমাদের সেদিকেই দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে হবে।
দেশরির্পোট/রবিন


ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন :

টি মন্তব্য
মন্তব্যে প্রকাশিত যেকোন কথা মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। DeshReport.com-এর সম্পাদকীয় অবস্থানের সঙ্গে এসব অভিমতের কোন মিল নেই। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নিবে না

আরো সংবাদ...

মন্তব্য করুন