রাজনীতি

বিরোধী দলকে পর্যুদস্ত করতেই বানোয়াট মামলার হিড়িক- মির্জা ফখরুল

সরকার গায়ের জোরে ক্ষমতা দখলে রাখতে চাচ্ছে। বিরোধী দলকে পর্যুদস্ত করতেই বানোয়াট মামলার হিড়িক- মির্জা ফখরুল

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জনসভার পরদিন গত সোমবার রাজধানীর ৩২ থানায় শত শত নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে ৩৭টি মামলা দায়েরের পর গ্রেফতার আতঙ্কে রয়েছে বিএনপি। গ্রেফতার এড়াতে অনেকে গা-ঢাকা দিয়েছেন। এরই মধ্যে বিএনপির ১৮১ নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করে আদালতে হাজির করেছে পুলিশ। মামলার এজাহারভুক্ত অনেকের খোঁজে গোয়েন্দা তৎপরতা চালাচ্ছে পুলিশ। থানা পুলিশের পাশাপাশি গোয়েন্দা পুলিশও বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চালিয়েছে। এদিকে, হঠাৎ করে মামলার পর উদ্ভূত পরিস্থিতিতে গতকাল বৈঠক করে করণীয় নির্ধারণ করেছে বিএনপির স্থায়ী কমিটি। তারা আইনি পথে মামলা মোকাবেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

সরকারবিরোধী উস্কানিমূলক বক্তব্য, গাড়ি ভাংচুর, পুলিশের কাজে বাধাসহ বিভিন্ন নাশকতার অভিযোগে সোমবার বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে মামলার মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বিএনপি বলছে, কোণঠাসা করতে তাদের বিরুদ্ধে গায়েবি মামলা করা হয়েছে। মামলার এজাহারের সঙ্গে ঘটনার কোনো মিল নেই।

গতকাল মঙ্গলবার দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ভাইস চেয়ারম্যান বরকত উল্লাহ বুলু, মোহাম্মদ শাজাহান ও দলের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা জয়নুল আবদিন ফারুক পৃথক বিবৃতিতে বিএনপির বিরুদ্ধে মামলায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। অন্যদিকে, দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী এক সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করে বলেছেন, একতরফা নির্বাচন করতেই সরকারের সাজানো ছকে বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে পুলিশ মামলা দিচ্ছে।

বিবৃতিতে মির্জা ফখরুল অভিযোগ করেন, বর্তমান সরকার জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকারগুলো পাত্তা দিচ্ছে না। সম্পূর্ণ গায়ের জোরে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলে রাখতে চাইছে। বিরোধী নেতাকর্মীদের ওপর অবর্ণনীয় নির্যাতন-নিপীড়নও অব্যাহত রেখেছে। একদিকে দুর্নীতি-দুঃশাসন, অন্যদিকে বিরোধী নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অসত্য মামলা। গ্রেফতার ও নির্যাতন-নিপীড়নের মাধ্যমে সারাদেশে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের রাজনৈতিকভাবে পর্যুদস্ত করতেই বানোয়াট মামলা দায়েরের হিড়িক পড়েছে।

নোয়াখালী জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আবু হাসান মো. নোমানকে গ্রেফতারের ঘটনায় নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে এ বিবৃতি দেন মির্জা ফখরুল।

একই ঘটনায় অপর এক বিবৃতি দিয়েছেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ভাইস চেয়ারম্যান বরকত উল্লাহ বুলু, মোহাম্মদ শাহজাহান, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা জয়নুল আবদিন ফারুক এবং যুগ্ম মহাসচিব ব্যারিস্টার এম মাহবুব উদ্দিন খোকন। নেতারা দেশব্যাপী বিএনপিসহ বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের পাইকারি হারে গ্রেফতারের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার তাদের পতন সুনিশ্চিত ভেবেই দমন-পীড়নের অংশ হিসেবে সারাদেশে বিএনপি এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের গ্রেফতারে মরিয়া হয়ে উঠেছে।

এদিকে রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, দলের নেতাকর্মীদের গ্রেফতারের জন্য পুলিশের কাছে আষাঢ়ে গল্পের একটা ফরম্যাট প্রস্তুত করা থাকে সব সময়। মামলা দেওয়া ও গ্রেফতারে ব্যবহার করে থাকে সেগুলো। এবারও পুলিশ তাই করেছে। সেই একই ফরম্যাটের ধারাবাহিকতায় দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা তৈমূর আলম খন্দকার, যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবীর খোকন, কেন্দ্রীয় নেতা আবদুস সালাম আজাদ, আসাদুল করিম শাহীন, মুনির হোসেন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

আইনি পথে মোকাবেলা :সারাদেশে নেতাকর্মী ও সিনিয়র নেতাদের নামে মামলা নিয়ে বৈঠক করেছে বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটি। গতকাল মঙ্গলবার বিকেল সোয়া ৫টা থেকে দেড় ঘণ্টার এ বৈঠকে সম্প্রতি মামলার পরিসংখ্যান নিয়ে নিজেরা উদ্বেগ প্রকাশ করেন। এ সময় নেতারা মামলার বিষয়ে করণীয় নিয়েও নিজেদের মধ্যে আলোচনা করেন। বৈঠকে উপস্থিত একজন নেতা জানান, সারাদেশের এসব মামলাকে তারা আইনিভাবে মোকাবেলা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এ ছাড়া এটা নিয়ে একটি সংবাদ সম্মেলনও করবেন তারা। বৈঠকে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ছাড়াও দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার, লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ও নজরুল ইসলাম খান উপস্থিত ছিলেন।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সিনিয়র সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেছেন, তাদের দলের নেতাকর্মীদের নামে এর আগেও অসংখ্য রাজনৈতিক মামলা রয়েছে। বিএনপিকে নির্বাচনের বাইরে রাখার জন্যই এখন নতুন করে মামলা দেওয়া হচ্ছে। এসব মামলায় বিএনপির নেতাকর্মী ছাড়াও অজ্ঞাত আসামি করা হচ্ছে। তাই এ ধরনের মামলায় শুধু নেতাকর্মী নয়, সাধারণ জনগণও আতঙ্কিত। কারণ, এ মামলা দিয়ে যে কোনো সময়ে যে কাউকে গ্রেফতার করতে পারবে পুলিশ।

হাতিরঝিল থানার ওসি আবু মোহাম্মদ ফজলুল করিম সমকালকে বলেন, সোমবার দায়ের করা মামলায় নতুন কোনো আসামি গ্রেফতার করা হয়নি। রিমান্ডে থাকা সাতজনকে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে।

হাতিরঝিল থানায় দায়ের করা মামলার এজাহার বিশ্নেষণ করে দেখা যায়, ফখরুল ইসলাম আলমগীরের উপস্থিতিতে ৩০ সেপ্টেম্বর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সমাবেশে সরকারবিরোধী উস্কানিমূলক বক্তব্য প্রদান করা হয়। এর পর সমাবেশ থেকে বাসায় ফেরার পথে হাতিরঝিল থানাধীন মগবাজার রেলগেটে ৭০-৮০ জন ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, জামায়াত ও শিবিরের নেতাকর্মীরা জড়ো হয়ে যান চলাচলে বাধা দেয়। পুলিশ তাদের রাস্তা থেকে সরে যাওয়ার কথা বললে তারা কর্ণপাত না করে পুলিশের ওপর আক্রমণ করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। এ সময় দুটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও একটি বলাকা বাস ভাংচুর করা হয়। তবে ক্ষতিগ্রস্ত কোনো গাড়ির নম্বর মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়নি। আত্মরক্ষায় গাড়ি দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে বলে দাবি করে পুলিশ।

হাতিরঝিল থানায় যাদের আসামি করা হয়েছে তারা হলেন- বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমান উল্লাহ আমান, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, কুমিল্লা জেলা বিএনপির ভাইস প্রেসিডেন্ট মোবাশ্বর আলম ভুঁইয়া, ৪১ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সাধারণ সম্পাদক আওলাদ হোসেন, গাজীপুর সিটি করপোরেশন ৪৮ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর শফি উদ্দিন, ১৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি রাশেদ বিন সোলায়মান, ৪১ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সভাপতি শামছুল হক, কুমিল্লা নাঙ্গলকোট থানা ছাত্রদলের সাবেক নেতা শিহাব খন্দকার, ২২ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির নেতা মোশাররফ, জামায়াতের রমনা থানার সমাজকল্যাণ সেক্রেটারি মোস্তফা হুমায়ুন সরকার, বিএনপিকর্মী মফিজুল ইসলাম, মোতাহার হোসেন, ইমরান হোসেন রিপন, ৩৬ নম্বর বিএনপির সভাপতি সিরাজুল ইসলাম, রমনা থানা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক শামসুল হক খান, বিএনপি নেতা মেরাজ, ৩৬ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রদল সভাপতি পিয়াস, বেলাল উদ্দিন ভুঁইয়া, মিঠুন পাটোয়ারী, ইমু, শাহান, হারুন, সাব্বির, সজীব, রুবেল, জাফর, রাহী, পারভেজ, শরীফ, রায়হান কবীর, আবু সালেহ, মোত্তাকিম, মাসুদ পারভেজ, শাকিল, সানাউল্লাহ, আরাফাত, অ্যাপোলো, নান্নু মিয়া, বাপ্পী খান, কাইয়ুম, রবিউল ইসলাম ও এনামুল হক।

এদিকে আদালতে প্রতিবেদন দিয়ে পুলিশ বলেছে, গ্রেফতার সব আসামি বিএনপি ও এর অঙ্গ-সংগঠনের নেতাকর্মী। তারা বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে ঢাকার বিভিন্ন এলাকার রাস্তায় অবস্থান নিয়ে যান চলাচলে বাধা দেন; সরকারবিরোধী স্লোগান দেন। এ ছাড়া পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছোড়েন, ককটেল বিস্ম্ফোরণের ঘটনা ঘটান। এসব নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড। তবে গ্রেফতার আসামিদের আইনজীবীরা আদালতের কাছে দাবি করেন, হয়রানি করার জন্য পুলিশ এসব আসামিকে রাস্তা থেকে ধরে নিয়ে মামলায় গ্রেফতার দেখিয়েছে। কারও বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ আদালতের কাছে দাখিল করতে পারেনি পুলিশ। শুধু সন্দেহের ভিত্তিতে তাদের গ্রেফতার করা হয়েছে।

 

দেশরির্পোট/আরেফিন

 


ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন :

টি মন্তব্য
মন্তব্যে প্রকাশিত যেকোন কথা মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। DeshReport.com-এর সম্পাদকীয় অবস্থানের সঙ্গে এসব অভিমতের কোন মিল নেই। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নিবে না

আরো সংবাদ...

মন্তব্য করুন