জাতীয়প্রধান সংবাদ

‘অতি ধনী’ বাড়ার হারে শীর্ষে বাংলাদেশ!

বিশ্বের যেকোনো দেশের তুলনায় বাংলাদেশে ‘অতি ধনী’ মানুষের সংখ্যা সবচেয়ে দ্রুতগতিতে বাড়ছে। লন্ডনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘ওয়েলথ এক্সে’র এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

অতি ধনীদের ওপর সর্বশেষ প্রতিবেদন গত সপ্তাহে প্রকাশ করে ওয়েলথ এক্স। প্রতিবেদনে অতি ধনী বা ‘আলট্রা হাই নেট ওয়ার্থ’ (ইউএইচএনডাব্লিউ) বলে তাদেরকেই বিবেচনা করা হয়, যাদের সম্পদের পরিমাণ তিন কোটি ডলার বা তার চেয়ে বেশি। অর্থাৎ বাংলাদেশি টাকায় যাদের সম্পদ আড়াইশ কোটি টাকার বেশি, তারাই ‘অতি ধনী’ বলে গণ্য হবেন।

প্রতিবেদনে দেখা যায়, বিশ্বে অতি ধনী মানুষের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি যুক্তরাষ্ট্রে। দেশটিতে ‘অতি ধনী’ মানুষের সংখ্যা প্রায় ৮০ হাজার।

দ্বিতীয় স্থানে আছে জাপান। তাদের অতি ধনী সংখ্যার মানুষের সংখ্যা প্রায় ১৮ হাজার। আর প্রায় ১৭ হাজার অতি ধনী মানুষ নিয়ে চীন আছে তৃতীয় স্থানে। তালিকায় প্রথম দশটি দেশের তালিকায় আরও আছে জার্মানি, কানাডা, ফ্রান্স, হংকং, যুক্তরাজ্য, সুইজারল্যান্ড ও ইতালি।

সবার শীর্ষে বাংলাদেশ!

অতি ধনীর সংখ্যার তালিকায় স্থান না মিললেও অতি ধনী মানুষের সংখ্যা সবচেয়ে দ্রুত হারে বাড়ছে যেসব দেশে, সেই তালিকায় বাংলাদেশের স্থান সবার ওপরে। ওয়েলথ এক্সের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে অতি ধনীদের সংখ্যা বাড়ছে ১৭ দশমিক তিন শতাংশ হারে। এই তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে আছে চীন। সেখানে অতি ধনীর সংখ্যা বাড়ছে ১৩ দশমিক ৭ শতাংশ হারে। এরপর আছে যথাক্রমে ভিয়েতনাম, কেনিয়া, ভারত হংকং এবং আয়ারল্যান্ড।

ওয়েলথ এক্স তাদের প্রতিবেদনে বলছে, ‘আলট্রা হাই নেট ওয়ার্থ’ বা অতি ধনী মানুষের সংখ্যা গত ৫ বছরে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে চীন ও হংকংয়ে। এর বিপরীতে জাপান, কানাডা, ইতালি ও যুক্তরাষ্ট্রে নতুন ধনী তৈরি হওয়ার গতি ধীর হয়ে এসেছে।

ওয়েলথ এক্স জানাচ্ছে, যদি বিশ্ব পরিসরে দেখা হয়, অবাক করা ব্যাপার হচ্ছে, নতুন ধনী তৈরির ক্ষেত্রে চীন এখন আর শীর্ষে নয়। সেখানে বাংলাদেশ সবার চেয়ে এগিয়ে।

২০১২ সাল থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশে প্রতিবছর ১৭ শতাংশ হারে অতি ধনীর সংখ্যা বেড়েছে। ভিয়েতনাম, কেনিয়া ও ভারতও এ ক্ষেত্রে খুব বেশি পিছিয়ে নেই।

কারা এই অতি ধনী?

অতি ধনীর সংখ্যা যে বাংলাদেশে সবচেয়ে দ্রুত হারে বাড়ছে, এই তথ্যে অর্থনীতিবিদরা মোটেই বিস্মিত নন।

ঢাকার সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘এই তথ্য থেকে আমি মোটেও অবাক হইনি। কারণ গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশে যে একটা গোষ্ঠীর হাতে এ ধরনের সম্পদ পুঞ্জীভূত হচ্ছে, সেটা আসলে দেখাই যাচ্ছে। এই সম্পদ তৈরির প্রক্রিয়া তো একদিনে তৈরি হয়নি। এটা কয়েক দশক ধরেই হয়েছে। এখন এটি আরও দ্রুততর হচ্ছে।’

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার গত কয়েক বছর ধরেই বেশ ভালো। তবে বাংলাদেশের চেয়ে অনেক বেশি প্রবৃদ্ধি হচ্ছে— এমন অনেক বড় বড় দেশ বিশ্বে রয়েছে। যেমন— চীন ও ভারত। কিন্তু এই প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, তাদের চেয়েও বাংলাদেশে ধনী লোক তৈরি হওয়ার হার অনেক বেশি।

এ বিষয়টিকে কিভাবে ব্যাখ্যা করা যাবে— এমন প্রশ্নের উত্তরে ড. ফাহমিদা বলেন, চীন ও ভারতে একসময় যেমন দ্রুত অর্থনৈতিক অগ্রগতি হয়েছে, সেখান থেকে অবস্থা একটু স্তিমিত হয়ে এসেছে। সেটা একটা কারণ। আরেকটা কারণ হচ্ছে, বাংলাদেশে ধনী ও গরীবের মধ্যে যে তফাৎ, এই তফাৎ অনেক বাড়ছে।

‘বাংলাদেশে সম্পদের একটা কেন্দ্রীভবন হচ্ছে। অর্থাৎ ওপরের দিকে যারা আছে, তারা সম্পদশালী হচ্ছে ক্রমান্বয়ে। নিচের দিকে যারা আছে, তাদের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি যতটা না হচ্ছে, তার চেয়ে বেশি উন্নতি হচ্ছে ওপরের দিকে যারা তাদের। ওপরের পাঁচ শতাংশের হাতে আরও বেশি করে সম্পদ পূঞ্জীভূত হচ্ছে,’— বলেন তিনি।

দুর্নীতির ভূমিকা কতটা?

বাংলাদেশে যারা অতি ধনী, তারা কোন কোন খাতে ব্যবসা-বাণিজ্য করে এই সম্পদ অর্জন করেছেন— জানতে চাইলে ড. ফাহমিদা বলেন, মূলত শিল্প ও সেবা- এই দু’টি খাতেই তারা বিনিয়োগ করছে। শিল্প খাতে তৈরি পোশাক শিল্প, ওষুধ শিল্প, জাহাজ ভাঙা শিল্প, চামড়া শিল্পে অনেকে বিনিয়োগ করেছেন। এর পাশাপাশি বাংলাদেশে এখন ভৌত অবকাঠামো সৃষ্টির একটি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এখানে অনেক বড় বড় প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে।

‘এসব প্রকল্পের সঙ্গে যারা জড়িত আছে, তাদের সবারই কিন্তু এখানে একটা সম্পদ তৈরির সুযোগ রয়েছে। আর তার পাশাপাশি সেবা খাতেও আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক-বীমা ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তিও একটি বিকাশমান খাত হিসেবে এসেছে,’- বলেন তিনি।

বাংলাদেশ অনেকের সম্পদশালী হওয়ার পেছনেই দুর্নীতির কথা শোনা যায়। এত বেশি সংখ্যায় অতি ধনী মানুষ তৈরির পেছনে কি এই দুর্নীতির কোনো ভূমিকা আছে?

এ প্রশ্নের উত্তরে ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘এ সম্পর্কে তো কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। তবে এশিয়া বা আফ্রিকার উন্নয়নশীল দেশগুলোতে যেটা হয়, যাদের হাতে সম্পদ আসে, সেটার পেছনে রাষ্ট্রীয় আনুকূল্যের একটা বড় ভূমিকা থাকে। রাষ্ট্রীয় আনুকূল্য যারা পায়, বা যাদের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার যোগাযোগ থাকে, প্রাথমিকভাবে তারাই সম্পদের মালিক হয়।’

‘আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে যেহেতু সুশাসনের অভাব থাকে বা প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা থাকে, তখন এই সুযোগটা একটা বিশেষ গোষ্ঠীর হাতে রয়ে যায়। খুব ক্ষুদ্র একটা গোষ্ঠী সম্পদের মালিক হয়, যাদের সঙ্গে প্রভাবশালীদের যোগাযোগ থাকে,’- বলেন তিনি। বিবিসি বাংলা।

 

 

দেশরির্পোট/আরএস


ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন :

টি মন্তব্য
মন্তব্যে প্রকাশিত যেকোন কথা মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। DeshReport.com-এর সম্পাদকীয় অবস্থানের সঙ্গে এসব অভিমতের কোন মিল নেই। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নিবে না

Tags

আরো সংবাদ...

মন্তব্য করুন