বিনোদন

সাংস্কৃতিক অঙ্গনে প্রত্যাশার নতুন বছর

এসেছে নতুন বছর ‘২০১৯’। সেই সাথে অনেক আবেগ-উৎকণ্ঠা, আশা-নিরাশা, সংকট-সমৃদ্ধি ও আনন্দ-বেদনার সাক্ষী হয়ে থাকলো বিদায়ী বছরটি। অতিক্রান্ত বছরের গ্লানি মুছে নতুন অগ্রযাত্রার শুভ কামনা করছেন প্রতিটি মানুষ। এমন প্রত্যাশা আমাদের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের মানুষদেরও। তাই নতুন বছরকে ঘিরে প্রত্যেকেই করেছেন নতুন নতুন পরিকল্পনা। দেখে নিই, নতুন বছরে কেমন প্রত্যাশা করছেন আমাদের সংস্কৃতিজনরা-

সরকার সংস্কৃতির কল্যাণে যুগান্তকারি কিছু কাজ করবে
রামেন্দু মজুমদার
বিশ্ববরেণ্য নাট্যব্যাক্তিত্ব
আমি মনে করি নতুন বছর এসেছে। পাশাপাশি নতুন সরকারও এসেছে। ভোট বিপ্লবের মধ্য দিয়ে সাম্প্রদায়িক শক্তিকে দেশবাসী সঠিক জবাব দিয়েছে। নতুন সরকার দেশের সংস্কৃতির জন্য নতুন শক্তি জোগাবে। আগামী পাঁচ বছরে স্বাধীনতার স্বপক্ষের এই সরকার সংস্কৃতির কল্যাণে যুগান্তকারি কিছু কাজ করবে। বলে আমার প্রত্যাশা। আমরা দলগতভাবে থিয়েটার থেকে এবছর দুটি নতুন নাটক মঞ্চে আনার পরিকল্পনা করেছি। একটি হচ্ছে ‘প্রেমপত্র’। এটি নির্দেশনা দেবে ত্রপা মজুমদার এবং অপর নাটক ‘ভ্রান্তিবিলাস’ নির্দেশনা দেব আমি নিজেই।
আমাদের সাংস্কৃতিক চর্চা আরো বেগবান ও সমৃদ্ধ হবে একজন সংস্কৃতির মানুষ হিসেবে এটিই প্রত্যাশা। তবে আগের বছরের ভুলত্রুটি শুধরে সামনের দিকে আমাদের পথ চলতে হবে। আমাদের দেশপ্রেম বাড়াতে হবে। বিদেশি সংস্কৃতিতে বিমুখ হয়ে আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতিকে আঁকড়ে ধরতে হবে। বিশ্বের দরবারে আমাদের সংস্কৃতি তুলে ধরতে হবে। একই সাথে বলব কেবল সংখ্যায় নয়, নতুন বছরে শিল্পমানের দিক থেকে আমাদের কিছু নাটক মঞ্চে আসবে। নতুন বছরে এটাই আমার প্রত্যাশা।

ঘরে ঘরে সাংস্কৃতিক দূর্গ গড়ে উঠবে
ড. ইনামুল হক
অভিনেতা-নাট্যকার
দেশব্যাপী মানুষের মধ্যে সংস্কৃতির একটা সাড়া পড়েছে। জেলা থেকে উপজেলা পর্যায়ে এখন সংস্কৃতি প্রসারিত হচ্ছে, যা ক্রমাগত আরও ছড়িয়ে যাবে। এই সরকারের উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় আমি বিশ্বাস করি ঘরে ঘরে সাংস্কৃতিক দূর্গ গড়ে উঠবে। এবার দলের ব্যানারে লাকী ইনামের রচনা ও নির্দেশনায় ‘লাল লাটিম’ নামে নতুন একটি নাটক মঞ্চে আসবে। এর কাজও অনেক দূর এগিয়েছে। নতুন বছর সবার ভালো কাটুক, সেই চাওয়ার সাথে সংস্কৃতি-সমৃদ্ধ বাংলাদেশের প্রত্যাশাই করছি।

মঞ্চ নাটক যাতে পেশাজীবিত্ব অর্জন করতে পারে
আতাউর রহমান
মঞ্চসারথি, অভিনেতা-নির্দেশক
আমাদের প্রত্যাশিত সংস্কৃতিবান্ধব ও স্বাধীনতার স্বপক্ষের সরকার আবারও ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছে। নতুন বছর সংস্কৃতির জন্য আরো কর্মমুখর ও কল্যাণময় হবে বলে আমার বিশ্বাস। শিল্প-সংস্কৃতির পাশাপাশি যোগাযোগ ও প্রযুক্তি আরও এগিয়ে যাবে বলে আশা করছি। আমি মনে করি, আমরা সাংস্কৃতিকভাবে এখন ভালো আছি। কারণ যখন এ সরকার ছিল না, তখন আমাদের সংস্কৃতি চর্চার ওপর নানারকম প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছিল। নাটকের ওপর একুশে পদকও বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। আমি চাইব মঞ্চ নাটক যাতে পেশাজীবিত্ব অর্জন করতে পারে। শিল্প-সংস্কৃতি চর্চায় যারা রয়েছে তারা যেন সম্মানের সাথে বাঁচতে পারেন।

একটি সুন্দর বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়
মামুনুর রশীদ
অভিনেতা, নাট্যকার-নির্দেশক
প্রতি বছর নিজের বর্তমান অবস্থান থেকে আরেকটু ভালো থাকার আকাঙ্ক্ষা নিয়েই সবাই নতুন বছর শুরু করে। পুরনো বছরের সাফল্য এবং ব্যর্থতা পেছনে ফেলে, একটি সুন্দর বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে সবাই এগিয়ে আসুক- এটাই নতুন বছরের প্রত্যাশা।

অপেরা হাউজ-এর কাজ যেন দ্রুত এগিয়ে চলে
লিয়াকত আলী লাকী
মহাপরিচালক, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি
একটি সৃজনশীল ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মাণে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি নিরলসভাবে দেশব্যাপী নানা কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। নতুন বছরে সঙ্গীত, নৃত্যকলা, নাটক, যাত্রাপালা, চারুকলাসহ সংস্কৃতির অন্যান্য বিষয়ে বিশেষ বিশেষ পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের বছরব্যাপী বর্ণাঢ্য কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়েছে। বিশেষ করে আমরা আশা করবো- যেন পেশাভিত্তিক সাংস্কৃতিকচর্চা দেখতে পাই এবং মূল ধারার সংস্কৃতিতে যেন ‘সিএইচআর’ যুক্ত করা হয়। একইসাথে উপজেলা পর্যায়ে আদায় হওয়া শুল্কের মধ্যে যেন সংস্কৃতির জন্য ১% বরাদ্দ রাখা হয়। প্রত্যেক উপজেলায় যেন দ্রুত উপজেলা কালচারাল সেন্টার গড়ে তোলা হয়। ইতোমধ্যে ১১টি উপজেলায় যা সম্পন্ন হয়েছে। একইভাবে বলবো সংস্কৃতির অগ্রযাত্রায় হাতিরঝিলে সুপরিকল্পিত আন্তর্জাতিক মানের অত্যাধুনিক অপেরা হাউজ-এর কাজ যেন দ্রুত এগিয়ে চলে। আমরা লোক নাট্যদল থেকে নতুন বছরে দুটি নাটক মঞ্চে আনবো। একটি হচ্ছে ড. মাহফুজা হিলালী রচিত ‘রাজকুমারী সুন্দরী বালা’ অপরটি বুদ্ধদেব বসুর ‘আমরা তিনজন’। এটি এ মাসেই মঞ্চে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। শিল্পকলা একাডেমি শিল্প-সংস্কৃতি সংরক্ষণ, চর্চা ও বিকাশে নিবেদিত। আমরা চাই, প্রতিটি ঘরে ঘরে সংস্কৃতির আলো প্রজ্বলিত হওয়ার মধ্যদিয়ে ‘সৃজনশীল বাংলাদেশ’ গড়ে উঠুক। সে লক্ষে সংস্কৃতির প্রতিটি বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে ব্যাপক কর্মযজ্ঞের ভেতর দিয়ে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি।

বাজেটের নূন্যতম ১% যেন সংস্কৃতিখ্যাতে বরাদ্দ হয়
গোলাম কুদ্দুছ
সভাপতি, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট
নতুন বছর, নতুন সরকার। স্বাধীনতার স্বপক্ষের সরকারকে জয়যুক্ত করার মধ্য দিয়ে অসাম্প্রদায়িক শক্তিকে পরাজিত করায় আমি দেশবাসীকে অভিনন্দন জানাই। প্রত্যাশা না থাকলে স্বপ্ন পূরণ হয়না। আমি প্রত্যাশা করবো নতুন সরকার জঙ্গিবাদ, দুর্নীতি, সন্ত্রাস এবং মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স দেখাবে। এই সরকার অর্থনীতিসহ বিভিন্নক্ষেত্রে অনেকদূর এগিয়েছে কিন্তু তার সাথে সাথে জাতিকে আধুনিক, বিজ্ঞানমনষ্ক ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাসমৃদ্ধ করে গড়ে তুলতে হবে। এজন্য সংস্কৃতির অগ্রগতির বিকল্প নেই। আমাদের দাবি, জাতীয় বাজেটের নূন্যতম ১% যেন সংস্কৃতিখ্যাতে বরাদ্দ দেয়া হয়। পুরো ঢাকায় যেন অন্তত ২০টি আধুনিক মঞ্চ নির্মাণ করা হয় এবং সারাদেশে যেন সংস্কৃতি বিষয়ে উৎসব, সেমিনার ও কর্মশালার আয়োজন করা হয়। আমাদের প্রত্যাশার সাথে যদি সরকারের নীতি ও কর্মকাণ্ড পুরোপুরি মিলে যায় তবেই অসাম্প্রদায়িক, দেশত্ববোধ সম্পন্ন, বিজ্ঞানমনষ্ক একটি সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ হয়ে উঠবে।

একেবারে প্রান্তিক-পর্যায়ে যদি সংস্কৃতি পৌঁছানো না যায়, সংস্কৃতিচর্চার পরিবেশ যদি গড়ে না ওঠে তাহলে এর বিকাশ ঘটবে না। আমরা সংস্কৃতিবান ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা লালন করা দলকে পুনরায় আমাদের রাষ্ট্রক্ষমতায় পেয়েছি। যারা স্বাধীনতার বিপক্ষের শক্তিকে মদদ দেয় জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাদের প্রত্যাখ্যান করেছে। মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের সরকার সর্বস্তরে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে দেশকে সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে নেবে। একই সঙ্গে নির্বিঘ্নে শিল্প-সংস্কৃতিকে প্রণোদনা ও পৃষ্ঠপোষকতা করবে এটাই প্রত্যাশা। পাশাপাশি যাতে করে একটি প্রগতিশীল, বিজ্ঞানমনষ্ক ও সৃজনশীল সমাজ গঠনে সংস্কৃতির শাখা-প্রশাখা পল্লবিত হয় সেই উদ্যোগ সরকারকে নিতে হবে। কেননা, নানা কুসংস্কার, ধর্মান্ধতা, পশ্চাৎপদতার করণে এবং সংস্কৃতির শিক্ষা না থাকায় দেশের বিশাল একটা জনগোষ্ঠী বিপথে নিমজ্জিত হচ্ছে। এজন্য যেকোনো মূল্যে তৃণমূল পর্যায়ে সংস্কৃতিচর্চাকে জোরদার করতে হবে। কেননা, মানুষের চিন্তা জগতের পরিবর্তনের জন্য সংস্কৃতির বিকল্প নেই। একই সাথে সংস্কৃতি খ্যাতে বাজেট বাড়াতে হবে।

সারাদেশের যাত্রাদলগুলো যেন প্রদর্শনীর অনুমতি পায়
যাত্রানট মিলন কান্তি দে
সভাপতি, বাংলাদেশ যাত্রাশিল্প উন্নয়ন পরিষদ
আমাদের প্রত্যাশাতো কোনো বছরই পূরণ হয় না। সব সময় আশায় গুড়ে-বালি। সারাদেশের অধিকাংশ যাত্রাদল প্রদর্শনী করার অনুমতি পায় না। শিল্পকলা থেকে নিবন্ধন পাওয়া দলও অনুমতি পাচ্ছে না, এটিতো খুবই সাংঘর্ষিক ব্যাপার। নতুন সরকারের কাছে দ্রুত এর শুরাহা কামনা করছি। নতুন বছরে আমাদের প্রত্যাশা হচ্ছে যাত্রাপ্রদর্শনীর সহজ অনুমতি পাওয়া এবং শিল্পকলার উদ্যোগে মাসব্যাপী একটি যাত্রা উৎসব হোক। এ বছর দেশীয় পালা মঞ্চায়নে উদ্ভূদ্ধকরণ বিভিন্ন পর্যায়ের বছরজুড়ে বেশ কিছু কার্যক্রম রয়েছে।

একাধিক নতুন নাটক মঞ্চে আনার পরিকল্পনা রয়েছে
শিমুল ইউসুফ
নাট্যজন ও সঙ্গীতশিল্পী
গেল বছরের একেবারে শেষের দিকে দলের নতুন নাটক হিসেবে আমরা নাট্যাচার্য সেলিম আল দীনের ‘পুত্র’ নাটকটি মঞ্চে এনেছি। নতুন বছরেও ঢাকা থিয়েটারের প্রযোজনায় একাধিক নতুন নাটক মঞ্চে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। যার মধ্যে নাসিরউদ্দিন ইউসুফের নির্দেশনায় দলে একটি নতুন নাটক মঞ্চে আনার প্রত্যাশা করছি। সমগ্র নাট্যাঙ্গন পুরো বছর এমনি কর্মব্যস্ত থাকবে বলে আশা রাখছি।

কামাল বায়েজিদ
সেক্রেটারি জেনারেল, বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশান
প্রতিটি উপজেলায় যেন কালচারাল কমপ্লেক্স গড়ে তোলা হয়
নাটক তথা সংস্কৃতির মানুষদের পাশাপাশি দেশবাসীকে নববর্ষের শুভেচ্ছা এবং নতুন সরকারকে স্বাগত জানাচ্ছি। সংস্কৃতিবান্ধব এই সরকারের কাছে প্রত্যাশা করবো- সকল নাট্যশিল্পী তথা সংস্কৃতিকর্মীদের বেতনভাতা প্রদানের পাশাপাশি ৬০ ঊর্ধ্ব সকল সংস্কৃতিকর্মীর চিকিৎসাভাতার ব্যবস্থা করা হয়। একইভাবে প্রত্যেক উপজেলায় মডেল মসজিদের মত কালচারাল কমপ্লেক্স গড়ে তোলা হয়। ফেডারেশনের উদ্যোগেও নতুন বছরে ব্যাপক কর্মসূচি আমরা হাতে নিয়েছি।

সাফল্যের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখতে চাই
জাহিদ রিপন
নাট্যজন ও চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ মূকাভিনয় ফেডারেশন
২০১৮টি স্বপ্নদলের চমৎকার কেটেছে। এ সাফল্যের ধারাবাহিকতায় ২০১৯-এ স্বপ্নদলের দু’টি প্রযোজনা ‘‘ডাকঘর’’ ও ‘‘স্পার্টাকাস’’ পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছি। একইসাথে নাট্যাচার্য সেলিম আল দীনের দীনের ‘‘স্বর্ণবোয়াল’’ মঞ্চে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। গত বছর মূকাভিনয় ফেডারেশন থেকে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে অনেকগুলো কার্যক্রম করেছি। এবারও সেই ধারা অব্যাহত রাখতে চাই।


ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন :

টি মন্তব্য
মন্তব্যে প্রকাশিত যেকোন কথা মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। DeshReport.com-এর সম্পাদকীয় অবস্থানের সঙ্গে এসব অভিমতের কোন মিল নেই। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নিবে না

আরো সংবাদ...

মন্তব্য করুন