বিনোদন

‘সিনেমার নামে চলছে মুরগী ধরার ধান্দা’

একটা সিনেমার মূলে থাকেন একজন প্রযোজক। অথচ বর্তমানে সিনেমা ভুগছে প্রযোজক খরায়। ফলস্বরূপ মৃতপ্রায় ইন্ডাস্ট্রি! নানা কারণে সিনেমায় লগ্নি করা থেকে দূরে সরে গেছেন অনেক প্রতিষ্ঠিত প্রযোজক। নতুন যারা আসেন তারাও টাকা লগ্নি করে সেটা উঠাতে না পেরে হতাশ হয়ে বিদায় নেন।

অথচ একটা সময়ে গোলা ভরা ধানের মতো হল ভরা সিনেমা ছিলো। শুধু ঈদই না, প্রিয় তারকার ছবি উৎসবের মতো মুক্তি পেত বছর জুড়েই। দর্শকদের ঢল নামতো সেসব ছবি দেখতে। সেই দিন এখন অতীত!

বছরে হাতে গোনা কয়েকটি সিনেমা মুক্তি পায়। সেগুলোও কেউ দেখে না। এর প্রভাবে হল বন্ধের মিছিল চলছে। যা কিছু বড় বাজেটের সিনেমা হচ্ছে তা দুই ঈদের উপরই ভর করে। অনেক সিনেমা হলে শুধু দুই ঈদেই সিনেমা প্রদর্শন হয়। বছরের বাকি সময় বন্ধ থাকে। কিংবা পুরনো অশ্লীল সিনেমা দেখিয়ে কিছু দর্শক ধরে রাখে।

সিনেমা হল চালু রাখার জন্য চাই প্রযোজক। যারা একটা সিনেমা নির্মাণেই ক্ষান্ত হবেন না। নিয়মিত থাকবে এ পাড়ায়। কারণ প্রযোজক নিয়মিত না হলে সিনেমার পুরো সিস্টেমেই নেমে আসবে অন্ধকার।

সিনেমা একটা ভাবনা। সেই ভাবনা বিকাশের জন্য চাই অর্থ। নইলে সমস্ত ভাবনাই অনর্থ। অর্থটা যিনি যোগান দেন তিনিই প্রযোজক।

তবে প্রযোজক না থাকার চেয়ে বড় হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছেন কিছু শখের প্রযোজক। সিনেমা নির্মাণ নিয়ে তাদের কোনো মাথাব্যথা নেই। পরিচালক কিংবা নায়িকার সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কের জের ধরে চলে আসেন তারা ইন্ডাস্ট্রিতে। অনেকে আসেন কালো টাকা সাদা করতে, কৌশলে।

তাদের দৃষ্টি সিনেমা বা সিনেমার ভালো-মন্দের দিকে থাকে না। তারা আসেন দুই চারটা নায়িকা বগলে নিয়ে ঘুরে বেড়ান, ফূর্তি করেন, আবার চলেও যান। কিন্তু দুর্গন্ধ ছড়িয়ে যান ইন্ডাস্ট্রির অলিতে গলিতে। যার দায় মেটায় সত্যিকারের প্রযোজকরা। অপবাদের শিকার হন নির্মাতা ও শিল্পীরাও।

সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, রাজধানীর মগবাজারে কিছু রেকর্ডিং স্টুডিওকে ঘিরে এসব অপেশাদার প্রযোজকদের আনাগোনা। তাদের সঙ্গী শিল্পের নাম বিক্রি করা কিছু অপদার্থ পরিচালক ও তৃতীয় সারির নায়িকারা।

প্রায় প্রতিদিন হচ্ছে মহরত। অনেক সময় আবার কিছু প্রযোজক আসছেন কিছু না বোঝেই। বলা চলে তারা ইন্ডাস্ট্রিতে ‘মুরগী’ হিসেবেই পরিচিত। কোনো নির্মাতা বা নায়িকার মিষ্টি কথায় মজে গিয়ে সিনেমার নামে কাড়ি কাড়ি টাকা জলে ফেলে সর্বস্বান্ত হয়ে বাড়ি ফিরেন।

এরাও চলে যান কিন্তু রেখে যান দুর্গন্ধ। মিডিয়াতে প্রচার করেন সিনেমায় প্রতারকদের আখড়া। তার জের টানতে হয় ইন্ডাস্ট্রিকে। অথচ সত্যিটা হলো তিনি ইন্ডাস্ট্রিতে সিনেমা বা শিল্প লালন করে এমন মানুষদের সঙ্গে মেশার সুযোগই পাননি। প্রতারকদের চক্রে পড়ে সব হারিয়ে সামগ্রিক সিনেমা জগতকে দোষারোপ করেন।

খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, প্রযোজক আনার নামে এইসব ‘মুরগী’ ধরে আনার পেছনে ব্যবহার হয় এফডিসির নাম। এফডিসির অনেক অসাধু লোকও জড়িত বলে জানা গেছে। এ বিষয়ে চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সাধারণ সম্পাদক জায়েদ খান বলেন, ফেসবুকে এত এত নায়ক-নায়িকা দেখি, অথচ এদের কাউকে চিনি না।

দু’দিন পরপর দেখি অডিও স্টুডিওগুলোতে ছবির মহরত হচ্ছে, দেখে নিজেরই হাসি পায়। কথায় আছে, আগে দর্শনদারি, পরে গুণবিচারি। যেসব নায়ক-নায়িকাকে দেখি, তারা তো নিজের দিকেই তাকিয়ে দেখে না। একটা কেক কাটে, পেছনে ব্যানারে লেখা থাকে মহরত। তিন-চারটা নায়িকা নিয়ে মহরত হয়ে যায়। এসব আসলে এক ধরনের প্রতারণা। নামে মাত্র প্রযোজকগুলো অসৎ উদ্দেশ্যে মেয়েগুলোকে ব্যবহার করছে মহরতের নামে।

আলু-পেঁয়াজের ব্যবসায়ী দুই-তিন লাখ টাকা দিয়ে নায়ক হয়ে যায়। আর এই নায়িকাগুলো তো আসলে পতিতা। একজন ব্যবসায়ীকে ফুঁসলিয়ে চলচ্চিত্রে নেমে নিজেকে নায়িকা হিসেবে পরিচয় দেয়। তাদের ছবি কিন্তু আলোর মুখ দেখে না।

পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান মানিক বলেন, এসব প্রযোজকরা ইন্ডাস্ট্রির জন্য লজ্জার। তারা মানহীন ছবি করে বেড়ান। আর তাদের নিয়ে আসে নায়িকারা। নিজের সামাজিক ও অসামাজিক দাম বাড়াতে নিজেকে নায়িকা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। চলচ্চিত্রের বাইরের মানুষগুলো তো আর জানেন না, এরা কোন শ্রেণির নায়িকা। আমি মনে করি, এসব ছবির নামে প্রহসন আমাদের চলচ্চিত্রের ইমেজ নষ্ট করছে। কারণ অনেকেই এসব নায়ক-নায়িকাকে দেখেই চলচ্চিত্রের অবস্থা নির্ণয় করছে।

মানিক আরো বলেন,আমাদের এফডিসির সব মানুষ ভালো তা নয়, আমাদের মধ্যেই কিছু ঠকবাজ, অসাধু মানুষ রয়েছেন, যাঁরা এই ছবিগুলোর সঙ্গে যুক্ত থাকেন। আমি মনে করি, এই মানুষগুলোকেও চিহ্নিত করা উচিত।

সেন্সর বোর্ডের সদস্য প্রযোজক খোরশেদ আলম খসরু বলেন, এই ছবিগুলোর বেশির ভাগই সেন্সর বোর্ড পর্যন্ত আসে না। কোনো সিনেমা হলে মুক্তিও পায় না। স্থানীয়ভাবে ডিশ চ্যানেলে প্রচার করে। আবার অনেকে নিজের ইউটিউব চ্যানেলে চালিয়ে দেয়। আমি মনে করি, এই বিষয়গুলোও নজরদারির মধ্যে নিয়ে আসা প্রয়োজন। বিষয়টি নিয়ে আমি আবারও মিটিংয়ে কথা বলব।


ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন :

টি মন্তব্য
মন্তব্যে প্রকাশিত যেকোন কথা মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। DeshReport.com-এর সম্পাদকীয় অবস্থানের সঙ্গে এসব অভিমতের কোন মিল নেই। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নিবে না

আরো সংবাদ...

মন্তব্য করুন