বিনোদন

চার মাসে কি ঘুরে দাঁড়াবে চলচ্চিত্র ?

ঢাকাই চলচ্চিত্রে চলছে এখন অশনি সঙ্কেত। বহুমুখী সমস্যায় ভুগছে দেশীয় চলচ্চিত্রশিল্প। মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সঙ্গে এখন নিম্নবিত্ত শ্রেণীও মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে বাণিজ্যিক ধারার চলচ্চিত্র থেকে। উন্মুক্ত আকাশ সংস্কৃতির যুগে নানামুখী চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন দেশীয় চলচ্চিত্রের বড় প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে সিনেমার গল্পহীনতা ও দক্ষ নির্মাতার অভাব। শিল্পের প্রতি দায়বদ্ধতাহীন প্রযোজকরা অল্প পয়সায় বেশি মুনাফার লোভে অদক্ষ নির্মাতাদের দিয়ে তৈরি করছেন ছবি। ফলে দুর্বল নির্মাণশৈলী, কারিগরি ত্রুটির সঙ্গে গল্পহীনতায় সিনেমা হারিয়েছে তার আবেদন। তাই পয়সা খরচ ও সময় নষ্ট করে দর্শক সিনেমা হলে গিয়ে ছবি দেখতে আগ্রহী নন। দর্শকশূন্যতায় ব্যবসায়িক লোকসানের মুখে একের পর এক বন্ধ হচ্ছে প্রেক্ষাগৃহ।

অন্যদিকে প্রযোজক, প্রদর্শক ও পরিচালকদের মধ্যে রয়েছে ঐক্যের অভাব। দোষারোপ করছেন একে অপরকে। এমন প্রেক্ষাপটে ভারতীয় চলচ্চিত্র চালিয়ে প্রেক্ষাগৃহে দর্শক ধরে রাখতে চাইছেন প্রদর্শকরা। ছবি আমদানি করতে না দিলে হল বন্ধ রাখার আল্টিমেটাম দিয়েছিলেন তারা। পরবর্তীতে তথ্যমন্ত্রীর সঙ্গে প্রদর্শক সমিতির সমঝোতা বৈঠকে হল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার হলেও দেশীয় চলচ্চিত্রের ঘুরে দাঁড়ানোর কোন লক্ষণ নেই। ছবি নির্মাণ কমে যাওয়ার সঙ্গে বছরে হাতেগোনা দু-একটি ছবি মুনাফার মুখ দেখলেও অধিকাংশ ছবি টানছে না দর্শক। এদিকে আবার লোকসানের কারণে মালিকরাও সিনেমা হলের পরিবেশের প্রতি নজর দিচ্ছেন না। অস্বচ্ছ পর্দা ও বাজে শব্দগ্রহণব্যবস্থা, ভাঙ্গা আসন, বাথরুমের নোংরা পরিবেশ হলবিমুখ করছে সিনেমাপ্রেমীকে। এ অবস্থায় চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই শিল্পের সঙ্গে সম্পর্কিতরা সমন্বিত পদক্ষেপ না নিলে হবে না সমস্যার সমাধান।

এটার সমধানের পথ কি হচ্ছে ? কি হচ্ছে? তবে?ই তবের উত্তর কারও কাছে নেই। আর দুদিন পর আসবে নতুন মাস, সেপ্টেম্বর। মানে বছর শেষ হতে বাকি থাকবে মাত্র তিন মাস। চলচ্চিত্র কী ঘুরে দাঁড়াতে পারবে এই চার মাসে? এমন প্রশ্ন যখন সামনে তখন শোনা যাচ্ছে সেপ্টেম্বরে মুক্তি তালিকায় আছে চারটি চলচ্চিত্র। এগুলো হলো- ‘মায়াবতী’, ‘অবতার’, ‘গার্মেন্টস শ্রমিক জিন্দাবাদ’ ও ‘পাগলামি’। এরই মধ্যে সেন্সর ছাড়পত্রও পেয়েছে ছবিগুলো।

১৩ সেপ্টেম্বর ‘মায়াবতী’ ও ‘অবতার’ নামে দুটি ছবি মুক্তি পাবে। মাহিয়া মাহি ও জে এইচ রুশো অভিনীত ‘অবতার’ ছবিটি পরিচালনা করেছেন মাহমুদুল হাসান শিকদার। ইয়াশ রোহান ও নুসরাত ইমরোজ তিশা অভিনীত ‘মায়াবতী’ পরিচালনা করেছেন অরুণ চৌধুরী। ২০ সেপ্টেম্বর মুক্তি পাবে মারুফ ও লাক্স তারকা অরিন অভিনীত ‘গার্মেন্টস শ্রমিক জিন্দাবাদ’। এটি পরিচালনা করেছেন মুস্তাফিজুর রহমান বাবু। কমল সরকার পরিচালিত ‘পাগলামি’ মুক্তি পাওয়ার কথা ২৭ সেপ্টেম্বর। এতে অভিনয় করেছেন বাপ্পী চৌধুরী ও কলকাতার শ্রাবণী রায়। অভিনয়শিল্পীদের তালিকা দেখে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক  পরিচালক বলেছেন, এদের ছবি দিয়ে কী চলচ্চিত্র ঘুরে দাঁড়াতে পারবে? মানুষতো এখন দেখা যাচ্ছে শাকিব খানের ছবিও দেখা কমিয়ে দিয়েছে। এর মধ্যে এদের ছবি কী দর্শক দেখবে?

তবে তিনি এও বলেছেন, যেখানে ঈদেই ছবি মুক্তি পায় মাত্র দুটি সেখানে একমাসে চারটি ছবি মুক্তি পাচ্ছে এটা অবশ্যই ভালো বিষয়। ছবি মুক্তি না পেলে দর্শক কী দেখবে? আমাদের উচিত ভালো গল্পের ছবি নির্মাণ করা। হ্যাঁ বড় বাজেটের ছবিগুলো বিশেষ দিবসেই মুক্তি পাক। আমার বক্তব্য হচ্ছে কোনো সপ্তাহে যেন হল নতুন ছবির অভাবে ফাঁকা না যায়।’ এক মাসে চারটি সিনেমা মুক্তির বিষয়টিকে ‘সিনেমার সুদিন’ বলে সম্প্রতি গণমাধ্যমে মন্তব্য করেন প্রযোজক পরিবেশক সমিতির নবনির্বাচিত সভাপতি খোরশেদ আলম খসরু।

তিনি বলেন, সিনেমার অভাবে হল বন্ধ হচ্ছে, বিষয়টা কিন্তু লজ্জাজনক। তাই সেপ্টেম্বরে চারটি ছবি মুক্তির বিষয়টি আমি চলচ্চিত্রের জন্য ইতিবাচকই বলব। দীর্ঘ প্রায় আট বছর পর সমিতির কমিটি গঠিত হয়েছে। আমরা কাজ শুরু করেছি। সিনেমা মুক্তির সময় প্রযোজকের বাড়তি খরচের চাপ অনেকটাই কমিয়ে এনেছি ইতিমধ্যে। আস্তে আস্তে প্রযোজকদের জন্য আরও সুযোগসুবিধা তৈরি হবে।

সম্প্রতি ‘অবতার‘ ছবির টিজার ও তিনটি গান ইউটিউবে মুক্তি পেয়েছে। পরিচালক বলেন, ‘ইচ্ছা ছিল রোজার ঈদে ছবিটি মুক্তি দেওয়ার। কিন্তু বিভিন্ন কারণে তখন গুছিয়ে উঠতে পারিনি। এখন আমরা পুরোপুরি প্রস্তুত। আর আমরা ভালো সময়ের অপেক্ষায় ছিলাম। সেই অনুযায়ী আগামী ১৩ সেপ্টেম্বর মুক্তি চূড়ান্ত করেছি।’ ইউটিউবে এসেছে ‘মায়াবতী’ ছবির টিজারও। ছবির পরিচালক অরুণ চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের ছবিটি সেন্সরে প্রশংসিত হয়েছে। আর যারা এতে কাজ করেছেন সবাই পরীক্ষিত। তাই ভালো কিছুই হবে।

এদিকে চলচ্চিত্র এক গবেষক বলেন, আগে জানতে হবে দর্শক কেন ছবি দেখতে প্রেক্ষাগৃহে যায় না। মূলত হলগুলো বাণিজ্যিক ভিত্তিতে সিনেমা চালায়। আর এখন দর্শকের জন্য ইউটিউব, প্রাইভেট চ্যানেলসহ ছবি দেখার অসংখ্য মাধ্যম তৈরি হয়েছে। বিনোদনের বহুমুখী মাধ্যম সৃষ্টি হয়েছে। প্রযুক্তি সহজলভ্য মাধ্যম হয়েছে। দলবদ্ধভাবে ছবি দেখার রেওয়াজটিও হারিয়ে গেছে। অন্যদিকে বর্তমানে দেশের বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রগুলোয় বিষয়বস্তুর প্রচ- অভাব রয়েছে। মৌলিক ও রুচিসম্মত গল্পের ছবি তৈরি হয় না। দর্শককে হলমুখী করার মতো মৌলিক ছবি নির্মিত হচ্ছে না। এর অন্যতম কারণ মেধাসম্পন্ন ও সৃজনশীল নির্মাতার অভাব। মান্ধাতা আমলের কৌশলে সিনেমার গল্প বললে চলবে না। দর্শক এখন মোবাইলে সারা বিশ্বের ছবি দেখার সুযোগ পাচ্ছেন। তাই দর্শককে হলে আনতে হলে ছবির কাহিনী ঢেলে সাজাতে হবে। যুক্ত করতে হবে দর্শক চিত্তহরণকারী বিষয়। সিনেমা নির্মাণের ক্ষেত্রে পরিচালককে এদেশের প্রেক্ষাপট এবং মানুষের মানসিকতাকে বুঝতে হবে। উপমহাদেশের লোকজন গান পছন্দ করেন সেই বিষয়টির যথার্থ প্রয়োগ ঘটাতে হবে চলচ্চিত্রে। মনপুরা চলচ্চিত্রটি দারুণ হিট হয়েছিল। ওই ছবির সফলতার অন্যতম অনুষঙ্গ ছিল গানের ব্যবহার।

বর্তমানে অধিকাংশ চলচ্চিত্রে এসব বিষয়ের সম্মিলন ঘটছে না। আবার এত সংকটের মধ্যে আবার কিছু শিল্পী উচ্চমূল্যের সম্মানী চাইছেন। দুঃসময়ে এটাও চলচ্চিত্র শিল্পের এগিয়ে চলার পথে অন্তরায়। একসময় রূপবান ছবিটি দারুণভাবে দর্শক টেনেছে। ওই সিনেমাটি অবাস্তব গল্পের হলেও ভেতরের কাহিনী দর্শকের মনে দাগ কেটেছে। এই ভূখ-ের মানুষের মানসিক কাঠামো সেটা গ্রহণ করেছে। তাই নির্মাতার দেশের ইতিহাস, অর্থনীতি, শিল্প, সংস্কৃতি, সাহিত্য সম্পর্কে ধারণা থাকতে হবে। পাশাপাশি চলচ্চিত্রের বিপণনটাও জানতে হবে। সেন্সরশিপের বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা থাকতে হবে। অনেক নির্মাতার সেন্সরশিপ সম্পর্কেও ধারণা নেই। অন্যদিকে একের পর এক সিনেমা হল ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছে। গুলিস্তান বা রূপমহলের মতো দর্শক সমাগম ঘটা হল আজ বিলুপ্ত। টিকেটের মূল্যটাও সহনীয় হতে হবে। তার ওপর রাজধানীর অল্প কিছু প্রেক্ষাগৃহ ছাড়া অধিকাংশ প্রেক্ষাগৃহের পরিবেশ খারাপ। কোন কোন হলে ছারপোকাও কামড়ায়। এসব হলে ছবি দেখার যন্ত্রপাতি মান্ধাতা আমলের অনাধুনিক। আরেক প্রতিবন্ধ হলো মালিকের কাছ থেকে প্রযোজক টিকেট বিক্রি থেকে প্রাপ্ত অর্থ ঠিকমতো পাচ্ছেন না।

প্রসঙ্গক্রমে এই গবেষক বলেন, দেশীয় চলচ্চিত্রকে বাঁচাতে হলে উপজেলা পর্যায়ে কালচারাল কমপ্লেক্স নির্মাণের মাধ্যমে সিনেমা হল গড়ে তুলতে হবে। সেখানে ই-টিকেটিং ব্যবস্থার পাশাপাশি টিকেটের মূল্য সহনীয় পর্যায়ে রাখতে হবে।


ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন :

টি মন্তব্য
মন্তব্যে প্রকাশিত যেকোন কথা মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। DeshReport.com-এর সম্পাদকীয় অবস্থানের সঙ্গে এসব অভিমতের কোন মিল নেই। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নিবে না

আরো সংবাদ...

মন্তব্য করুন