বিনোদন

আজ নায়ক রাজের ৭৯তম জন্মদিন

বাংলাদেশের কিংবদন্তি চলচ্চিত্র অভিনেতা নায়করাজ রাজ্জাকের ৭৯তম জন্মদিন আজ। গত ২০১৭ সালের ২১ আগস্ট পরপারে পাড়ি জমান তিনি। তার হঠাৎ চলে যাওয়ায় চলচ্চিত্রে বিশাল শূন্যতার সৃষ্টি হয়। এ মহান নায়ককে দেশের বন্ধু ও সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে ভক্ত-দর্শক কেউই ভোলেননি।

রাজ্জাক আছেন আমাদের সবার মাঝে

ফারুক

সব চেয়ে কাছের মানুষ ছিলেন আমাদের রাজ্জাক ভাই । বড় ভাই হিসেবে সব সময় জেনেছি এবং বিপদ-আপদে সব সময় তাকে কাছে পেয়েছি। এটা ভীষণ সত্যি যে, বাংলা সিনেমার ইতিহাসে তিনি এমনভাবে জড়িয়ে আছেন যে, তাকে ছাড়া বাংলা সিনেমা কল্পনাই করা যায় না। একজন নায়করাজ রাজ্জাক আমাদের চলচ্চিত্রের অহঙ্কার। আমি আর রাজ্জাক ভাই খুব কাছাকাছি সময়ে চলচ্চিত্রে কাজ শুরু করেছিলাম। স্বাভাবিকভাবে সবার ধারণা, আমাদের মধ্যে একটা প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ সম্পর্ক ছিল।

কিন্তু সেটি ছাপিয়ে আমাদের মধ্যে একটা দারুণ আন্তরিকতাপূর্ণ ও ভালোবাসার সম্পর্ক তৈরি হয়ে গিয়েছিল। আমাদের সম্পর্ক ছিল অম্লমধুর। রাজ্জাক ভাইয়ের সঙ্গে প্রথম পরিচয় এফডিসিতে। তখন এফডিসিতে যেতে আমি খুব ভয় পেতাম। রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত থাকতাম। আমার এক বন্ধু চলচ্চিত্র প্রযোজনা করেছিল। ছবির নাম আর মনে নেই। রাজ্জাক ভাই ওই ছবিতে অভিনয় করেছিলেন। কিন্তু ছবিটি নিয়ে জটিলতা দেখা দেয়। তখন আমিসহ কয়েকজন গিয়েছিলাম ঝামেলা মেটাতে।

কবরী

এখনও তার কর্মের মধ্যে আমরা তাকে পাই। স্মৃতির মধ্যে আমরা তাকে পাই। তাছাড়া তার সঙ্গে আমার সবচেয়ে বেশি ব্যবসায় সফল ছবি আছে। সহকর্মী হিসেবে তিনি খুব উদার মনের মানুষ ছিলেন। ব্যক্তিজীবনেও তিনি একজন ভালো মানুষ ছিলেন। তিনি আমাদের চলচ্চিত্রের গর্ব। এ দেশের চলচ্চিত্রে তার অসংখ্য অবদান রয়েছে, যা প্রজন্মের পর প্রজন্মের কাছে শিক্ষণীয় বিষয় হয়ে রবে। দিন, তারিখ, মাস, বছর কোনোটাই মনে নেই। শুধু মনে আছে, গাজী মাজহারুল আনোয়ারের যোগাযোগ ছবির মাধ্যমে রাজ্জাকের সঙ্গে আমার যোগাযোগ হয়। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, শেষ পর্যন্ত ছবিটি আর তৈরি হয়নি।

এই ছবির জন্য কথা বলতে গিয়ে গাজী মাজহারুল আনোয়ারের সঙ্গেও পরিচয় হয়। এরপর তার বাসায় রাজ্জাক সাহেবের সঙ্গে অনেক গল্প হয়। একটা পরিকল্পনাও হয়। তখনো আমি তার সঙ্গে কোনো ছবিতে অভিনয় করিনি। তবে যোগাযোগ ছবি নিয়ে আলাপ করতে করতে আমাদের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কও তৈরি হয়ে যায়। ‘ময়নামতি’র পর আমাদের নিয়ে হইচই শুরু হয়ে যায়।

আলমগীর

নায়করাজ রাজ্জাক ছিলেন পরিশ্রমী মানুষ। নিজের অভিনয়সত্তা দিয়ে তিনি সফল নায়কে নিজেকে পরিণত করতে পেরেছিলেন। এ জন্য সবাই তাকে নায়করাজ উপাধিতে ভূষিত করতে বাধ্য হয়েছিলেন। রাজ্জাক ভাই মনে-প্রাণে একজন শিল্পী ছিলেন। তিনি ছিলেন সত্যিকারের কিংবদন্তি- এটি অস্বীকার করার উপায় নেই। নায়ক হিসেবে আমাদের চলচ্চিত্রকে দর্শকের কাছে তিনিই জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন। এ দেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে তিনি বিশাল একটি স্থান দখল করে আছেন। এটিই স্বাভাবিক।

রাজ্জাক ভাইয়ের প্রতিভা, পরিশ্রম ও ভাগ্য চলচ্চিত্রে এতটাই সহায় ছিল যে, তাকে কখনো পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। আমাদের প্রিয় রাজ্জাক ভাইয়ের আজ জন্মদিন। এদিনটি আমার কাছে একটু আলাদাভাবে স্মরণ করিয়ে দেয়। কারণ রাজ্জাক ভাইয়ের এক জন্মদিনের অনুষ্ঠানে মায়ের মৃত্যু সংবাদ পাই। তাই দিনটি আমার কাছে সব সময়ই স্মরণীয়। রাজ্জাক ভাইকে আমি আপন ভাই-ই মনে করি।

ববিতা

রাজ্জাক ভাই তো একটা ইনস্টিটিউশন। তার হাত ধরেই তো চলচ্চিত্রে আসা। ওনার কাছ থেকেই আমি সব শিখেছি। রাজ্জাক ভাই চলচ্চিত্রে আসেন জহির রায়হানের হাত ধরে। আমিও চলচ্চিত্রে আসি জহির ভাইয়ের সিনেমার মাধ্যমেই। প্রথম চলচ্চিত্র ‘সংসার’-এ রাজ্জাক ভাই ছিলেন আমার বাবা। আর সুচন্দা আপু ছিলেন আমার মা চরিত্রে। এরপরের চলচ্চিত্র ‘শেষ পর্যন্ত’ সিনেমায় আমি ছিলাম রাজ্জাক ভাইয়ের নায়িকা। তাই রাজ্জাক ভাই ছিলেন আমার অভিভাবক। তিনি ছিলেন সব সময় ছায়া হিসেবে।

আমার দীর্ঘ অভিনয় জীবনের একটা পিলারের নাম রাজ্জাক। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে রাজ্জাক যেমন একটি উজ্জ্বলতম নক্ষত্র, আমার জীবনেও রাজ্জাক ভাই তেমন। ছিলেন সবচেয়ে প্রিয় অভিভাবক। আমার কাজ নিয়ে সব সময় দিকনির্দেশনা দিতেন নায়করাজ রাজ্জাক। রাজ্জাক ভাইয়ের নিজ প্রডাকশন হাউস রাজলক্ষ্মীর বেশিরভাগ ছবির নায়িকা আমি। এটা নিয়ে আমি গর্ববোধ করি।

উল্লেখ্য ১৯৪২ সালের ২৩ জানুয়ারি কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন রাজ্জাক। স্বাধীনতার আগে ১৯৬৪ সালে ভারত ছেড়ে স্ত্রী লক্ষ্মী এবং একমাত্র সন্তান বাপ্পারাজকে নিয়ে অনিশ্চিত গন্তব্য ঢাকায় আসেন। পরবর্তীতে নিষ্ঠা এবং মেধার অসামান্য সমন্বয়ে নিজেকে চলচ্চিত্রে নায়করাজ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। ২০১৭ সালের ২১ আগস্ট মৃত্যুবরণ করেন তিনি। প্রায় ৫০ বছরের অভিনয় জীবনে ‘বেহুলা’, আগুন নিয়ে খেলা, এতটুকু আশা’, ‘নীল আকাশের নীচে’, ‘জীবন থেকে নেয়া’, ‘অবুঝ মন’, ‘রংবাজ’, ‘ওরা ১১জন’, ‘আলোর মিছিল’, ‘অশিক্ষিত’, ‘ছুটির ঘণ্টা’, ‘বড় ভাল লোক ছিল’, ‘ও আমার দেশের মাটি’সহ প্রায় ৫০০টি বাংলা ও উর্দু ভাষার চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। ১৬টি চলচ্চিত্রের পরিচালক রাজ্জাকের মালিকানাধীন রাজলক্ষী প্রোডাকশনের ব্যানার থেকে বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের কয়েক দশকের প্রধান অভিনেতা হিসেবে বিবেচিত রাজ্জাক শ্রেষ্ঠ অভিনয়ের জন্য মোট পাঁচবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। সংস্কৃতিতে বিশেষ ভূমিকা রাখার জন্য বাংলাদেশ সরকার ২০১৫ সালে স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করেন।

আজকের দিনে নায়ক রাজ্জাককে স্মরণ করতে তার পরিবারের সদস্যরা নানা উদ্যোগ নিয়েছেন। নায়ক রাজের জীবনের শেষ ক’টি বছরে যে সবসময়ই তার পাশে ছিলেন তার ছোট ছেলে খালিদ হোসেন সম্রাট। তিনি জানালেন, আজ সকালে রাজধানীর বনানীর কবরস্থানে যেখানে নায়করাজ চিরনিদ্রায় শুয়ে আছেন সেখানে পরিবারের পক্ষ থেকে কোরআন পাঠ ও দোয়া করা হয়। বাদ জোহর গুলশান আজাদ মসজিদ সংলগ্ন মাদ্রাসার শিক্ষার্থী, অন্যান্য এতিম, গরিবদের দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বাদ আছর গুলশান আজাদ মসজিদেই নায়করাজের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করে দোয়া করা হবে।

এছাড়া নায়করাজ রাজ্জাকের জন্মদিন উপলক্ষে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত বায়োপিকটি চ্যানেল আইতে প্রচার হবে আজ বিকেল ৩-৩০ মিনিটে। ঢাকার চলচ্চিত্রেরর প্রাণপুরুষ রাজ্জাকের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে ‘রাজাধিরাজ রাজ্জাক’ নামের এই চিত্রগাথা প্রচার হয়েছিল। বড় পর্দার বড় এই নায়কের ভক্তদের জন্য বায়োপিকটি হলেও প্রদর্শিত হয়েছে। এর পাশাপাশি ফিল্ম আর্কাইভেও এটি সংরক্ষিত হয়েছে।


ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন :

টি মন্তব্য
মন্তব্যে প্রকাশিত যেকোন কথা মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। DeshReport.com-এর সম্পাদকীয় অবস্থানের সঙ্গে এসব অভিমতের কোন মিল নেই। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নিবে না

আরো সংবাদ...

মন্তব্য করুন