বিনোদন

‘পোস্টারম্যান’র চলে যাওয়ার ১৭ বছর

ঢাকাই ছবির কিংবদন্তি কৌতুক অভিনেতা দিলদার। তিনি ছিলেন ঢাকাই সিনেমার ব্র্যান্ড। যতো বড় নায়ক-নায়িকারই ছবি হোক না কেন পোস্টারে দিলদার ছিলেন অবধারিত। ইন্ডাস্ট্রির মানুষেরা তাকে সিনেমার ‘পোস্টারম্যান’ হিসেবেও সম্মান দেখাতেন।

সিনেমাতে তার উপস্থিতি মানেই বাড়তি বিনোদনের আহ্বান। গল্পে আর চরিত্রে তিনি দুঃখ ভুলানো মানুষ। ছবি দেখতে দেখতে কষ্ট-বেদনায় মন যখন আচ্ছন্ন হয়ে থাকতো তখনই তিনি হাজির হতেন হাসির সুবাস ছড়িয়ে।

বাস্তবতার দৈনন্দিন ঘানি টানা শেষে ক্লান্ত শরীরে সাধারণ দর্শক যখন তার অভিনয় দেখতেন, তখন তারা মুগ্ধ হতেন, প্রাণ খুলে হাসতেন, ভুলে যেতেন সারা দিনের সব কষ্ট। তার হাঁটা-চলা, বাচন ভঙ্গি, অভিনয়ের সাবলীলতার পরতে পরতে থাকতো আনন্দের ছড়াছড়ি।

শুধু তাই নয়, তার অভিনীত চলচ্চিত্রের কাহিনিতে কিংবা নায়ক-নায়িকার অভিনয় দক্ষতায় ঘাটতি থাকলেও দর্শক সেটি দেখতে এতটুকু বিরক্ত হননি। এমনকি অনেক চলচ্চিত্রের শেষ দৃশ্যে তার সংলাপ দিয়েই কাহিনির শেষ হওয়াটা স্বাভাবিক ব্যাপারে পরিণত হয়েছিল এই ইন্ডাস্ট্রিতে।

তিনি দিলদার। একটা সময় ছিলো যখন, কেউ কাউকে হাসালেই তাকে ‘দিলদার’ উপাধি দেয়া হতো। বলা চলে প্রবাদে পরিণত হয়েছিলেন এই অভিনেতা। আশি-নব্বই দশকের চলচ্চিত্রে দিলদার আর কৌতুক হয়ে ওঠেছিলো সমার্থক।

অনেকদিন হলো তিনি আর বেঁচে নেই। তাকে আর মনেও পড়ে না তেমন করে। নিরবেই চলে যায় এই অভিনেতার জন্ম-মৃত্যুদিন। আজ ১৩ জুলাই দিলদারের ১৭তম মৃত্যুবার্ষিকী। তার উত্তরসূরি হিসেবে কাউকে চোখে পড়েনি এ অঙ্গনে। দিলদার অভিনীত চলচ্চিত্র এখনো প্রচার হয় বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে। তার মতো কেউ আর দর্শক হাসাতে পারেন না।

১৯৪৫ সালের ১৩ জানুয়ারি চাঁদপুরে জন্মগ্রহণ করেন দিলদার। তিনি এসএসসি পাশ করার পর পড়াশোনার ইতি টানেন। ২০০৩ সালের এই দিনে ৫৮ বছর বয়সে তিনি জীবনের মায়া কাটিয়ে চিরদিনের মতো পৃথিবী ত্যাগ করেন। এতগুলো বছর পেরিয়েও দর্শকের মনে দিলদার থেকে গেছেন অসংখ চলচ্চিত্রে তার দুর্দান্ত অভিনয়ে; কৌতুক অভিনেতার কিংবিদন্তি হয়ে।চলে যাওয়ার সময় তিনি রেখে যান স্ত্রী রোকেয়া বেগম এবং দুই কন্যাসন্তান মাসুমা আক্তার ও জিনিয়া আফরোজকে।

জিনিয়া আফরোজ বলেন, বাবা চলচ্চিত্রের মানুষের যে কোনো বিপদ-আপদে সবার পাশে দাঁড়াতেন। তাই চলচ্চিত্র থেকে প্রাপ্ত অর্থ সেই জায়গাতেই তার ব্যয় হয়ে যেত বেশি। ‘বাবা জীবিত অবস্থায় আমার মা একটা বুদ্ধির কাজ করেছিলেন, যার ফল আমরা এখন ভোগ করছি। বাবা যা আয় করতেন, ওখান থেকে টাকা জমিয়ে সারুলিয়ায় (ডেমরা) একটা পাঁচতলা বাড়ি করেছেন। ওই বাড়িটির নির্মাণকাজ শেষ হয় ১৯৯৪ সালে। এখন চারতলা পর্যন্ত ভাড়া দেওয়া এবং পাঁচতলায় আমার মা মাঝেমধ্যে থাকেন। এ ছাড়া তিনি চাঁদপুর ও ঢাকায় আমাদের দুই বোনের কাছেও থাকেন। আল্লাহর রহমতে আম্মার শরীর ভালো আছে।

১৯৭২ সালে ‘কেন এমন হয়’ নামের চলচ্চিত্র দিয়ে অভিনয় জীবন শুরু করেন দিলদার। আর পেছনে ফিরে তাকাননি তিনি। অভিনয় করেছেন ‘বেদের মেয়ে জোসনা’ ‘বিক্ষোভ’, ‘অন্তরে অন্তরে’, ‘কন্যাদান’, ‘চাওয়া থেকে পাওয়া’, ‘সুন্দর আলীর জীবন সংসার’, ‘স্বপ্নের নায়ক’, ‘আনন্দ অশ্রু’, ‘শান্ত কেন মাস্তান’সহ অসংখ্য জনপ্রিয় সব চলচ্চিত্রে।

দিলদারের জনপ্রিয়তা এতটাই তুঙ্গে ছিল যে, তাকে নায়ক করে নির্মাণ করা হয়েছিল ‘আব্দুল্লাহ’ নামে একটি চলচ্চিত্র। নূতনের বিপরীতে এই ছবিতে বাজিমাত করেছিলেন তিনি। দারুণ জনপ্রিয়তা পেয়েছিলো ছবিতে ঠাঁই পাওয়া গানগুলো।

সেরা কৌতুক অভিনেতা হিসেবে ২০০৩ সালে ‘তুমি শুধু আমার’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের সুবাদে তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারও লাভ করেন। জীবনভর অভিনয় করে যে বছর সেরার স্বীকৃতি পেলেন সে বছরই তিনি দেশ বিদেশে বাংলা ছবির কোটি কোটি দর্শককে শোক সাগরে ভাসিয়ে চলে গেলেন আর না ফেরার দেশে।

তার মৃত্যুর পর আরও অনেক কৌতুক অভিনেতাই এসেছেন, আবার সময়ের স্রোতে হারিয়েও গেছেন। কিন্তু কেউই দিলদারের অভাব পূরণ করতে পারেননি। নন্দিত এই অভিনেতাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি

 


ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন :

টি মন্তব্য
মন্তব্যে প্রকাশিত যেকোন কথা মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। DeshReport.com-এর সম্পাদকীয় অবস্থানের সঙ্গে এসব অভিমতের কোন মিল নেই। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নিবে না

আরো সংবাদ...

মন্তব্য করুন