সাহিত্য

প্রথম প্রেম, মনের গভীরেই থেকে যায় আজীবন !

রবিউল ইসলাম, নিউজ রুম এডিটর, সময়ের কণ্ঠস্বর- গ্রামের ধূলা-বালির কাঁচা পথ। কখনও সেটা সুবিস্তীর্ণ মাঠের মধ্যে অস্পষ্ট, কখনও বা ক্ষুদ্র গ্রামের মধ্যে লুপ্ত, অবরুদ্ধ, আর সেই পথেই ছিল আমার প্রাইমারি স্কুলের যাত্রা। প্রাইমারিতে কিছুটা ভালো ছাত্র হলেও যখন হাইস্কুলের দরজায়, তখন যেন খেলাধুলার মাঝে পড়াশুনা ছিল শুধু নামে মাত্র। তখনও কিঞ্চিৎ ভালো ছাত্র ছিলাম।
সারাদিন গ্রামের বন্ধুদের সাথে উল্লাস, হৈহুল্লা আর খেলাধুলা, সন্ধ্যা নামতে না নামতেই বিদ্যুৎবিহীন রুমে ঘুমিয়ে যাওয়াটাই ছিল রুটিন মাফিক। আর স্কুল ফাঁকি দিয়ে গ্রামের ফাঁকা মাঠে ক্রিকেট খেলা এবং বিভিন্ন বাড়িতে দৌড়ে চোর-পুলিশ খেলতে গিয়ে বাবা-মার থেকে পিটুনি খাওয়াটাও ছিল দৈনিক রুটিনের খাতায় লেখা আরেকটা লাইন। অন্যদিকে বছর শেষে পরীক্ষায় টেনে টুনে পাস করাটাই ছিলো যেন মুখ্য।

অষ্টম শ্রেণীর ফাইনাল পরীক্ষার ফলাফলে ক্লাস রোল যখন ৭ থেকে ২৪ এ পৌঁছেছিল, তখন স্যার একদিন বলেছিলেন “কোন রকম কানের কাছ দিয়ে এবারের মত বেঁচে গেছিস, আগামীতে আর পার নয়’। এই হলো আমার পড়ালেখা নিয়ে স্যারের দেওয়া সার্টিফিকেট। অন্যদিকে বাবা-মা আর এলাকাবাসীর দেওয়া সার্টিফিকেট নাই বা উল্লেখ করলাম।

সেদিনের পর থেকেই নিজেকে ঘুরে দাঁড় করিয়েছি। একটা সময় টিফিনে যখন অন্যরা মাঠে খেলায় মগ্ন থাকতো, আর আমি তখন টিফিন পরবর্তী ক্লাসের পড়া রেডি করা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়তাম।

সব কিছুই স্বাভাবিক ভাবেই চলছিল। হঠাৎ একদিন বাদসাধলো একটা প্রাইভেট। ভোরের মৌনতা ভেদ করে একদিন প্রাইভেট পড়তে গেলাম গণিত স্যারের বাসায়। হুম, সেই প্রাইভেটেই আমার জীবনের প্রথম মনোরানীর আবির্ভাব। সেদিন তাকে প্রথম দেখাতেই বড্ড ইচ্ছের দানা বেঁধেছিল আত্মার ধারের কাছে আনতে। কিন্তু না, সেদিন পারিনি, সেবার তার অবস্থান ছিলো ক্ষণিকের মাত্র। পরে অবশ্য পোষে আনতে মাসখানিক লেগে গিয়েছিল। আর তখন আত্তার কাছে নয় সরাসরি মনোরাজ্যের সিংহাসনে গিয়ে হাজির। সেই থেকেই তার কড়া নাড়া শুরু আমার মন মন্দিরে।

বন্ধুত্বের দাবি নিয়ে দুজনের শুরু হয়েছিল অভিযান, কথাপত্থনে করেছিলে আমার সাথে কত অভিমান। ভালোবাসার হাত ছাঁনি দিয়ে ডেকেছে আমায়, আর তাই তো আঁকড়ে ধঁরেছিলাম হাতটা তোমার। কিন্তু সেই হাত কি বেশীদিন ধরে রাখার সোভাগ্য হয়েছিল আমার? নাহ হয়নি!

তখন সবসময় আমি ভাবতাম আমার ক্যারিয়ার নিয়ে, আর ও বিয়ে নিয়ে। তখন আমার বয়সই বা কত, বিয়ে মানেটাই সেদিন বুঝতে শিখিনি। তবে হ্যা! শিখেছিলাম, যেদিন চোখের সামনে দিয়ে দল বেঁধে গাড়ি এসে আমার স্বপ্নের রাজকন্যাকে বঁধু বেশে সাজিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলো। তখন বুঝিছিলাম সত্যি ভালোবাসা কি? আর সেদিনই আমার ভিতরটাকে বুঝিয়ে দিয়েছিলো আসলেই ভালোবাসার শুরু হয়, শেষ হয় না। স্ক্লুল কলেজ পেরিয়ে আজ দৌড়াচ্ছি ভার্সিটিতে। তবুও সেদিন গুলোর স্মৃতি দূর হয়নি মন থেকে, ভুলে যাইনি অন্যের ঘরে থাকা আমার রাজকন্যাকে।

সত্যি প্রথম প্রেমের রেশ থেকে যায় অনেক দিন। একটা তাড়না, তিক্ত-মধুর এক অনুভূতি মনকে আচ্ছন্ন করে রাখে বহুদিন। অনেকের মনে অতীত স্মৃতি তাড়িয়ে বেড়ায়। স্মৃতি রোমন্থনে অনেকে আবার আবেগী হয়ে ওঠেন। আর সেই আবেগে নিজের জীবনটা পর্যন্ত বিলিয়ে দিতেও কিঞ্চিৎ কুণ্ঠাবোধ করেন না।

কিন্তু কেন প্রথম প্রেমের সেই অনুভূতি সহজে ভোলা যায় না? এ বিষয়ে কিন্তু রয়েছে গবেষকেদের নানা মত।

মার্কিন দৈনিক দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রথম প্রেমের রেশ নিয়ে গবেষণা হয়েছে যৎসামান্য। তবে মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, এটা অনেকটাই স্কাইডাইভ বা প্রথমবার আকাশ থেকে লাফ দেওয়ার মতো ঘটনা। প্রথমবারের ঘটনাটি যেভাবে মনে গেঁথে যায়, আর দশবার লাফ দিলেও সেই আগের স্মৃতিটাই বেশি নাড়া দিয়ে যায়।

গবেষকদের মতে, পরের অভিজ্ঞতার চেয়ে প্রেমের ক্ষেত্রে প্রথম অভিজ্ঞতার অনেক বিষয় বেশি মনে থাকে। সম্ভবত এর মধ্যে রোমাঞ্চ আর উত্তেজনা ভরা থাকে। বিশেষ করে যদি এর মধ্যে ভয়ের কোনো অভিজ্ঞতা থেকে থাকে। প্রেমে পড়াটা অবশ্য একধরনের ভয়ের বিষয়। কারণ এতে প্রত্যাখ্যাত হওয়া, আশা পূরণ করতে না পারার, আশা পূরণ না হওয়ার ভয় থেকে যায়। প্রথম প্রেমের ক্ষেত্রে উদ্বেগ সবচেয়ে বড় বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

নিউইয়র্ক স্টেট ইউনিভার্সিটির মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক আর্ট অ্যারন বলেন, ‘যে কোনো বিষয়ে আপনার প্রথমবারের অভিজ্ঞতা অন্য সময়ের চেয়ে বেশি ভালো মনে থাকে। সম্ভবত প্রথমবার কোনো কাজ করার সময় কিছুটা ভীতি, কিছুটা উত্তেজনা কাজ করে সে জন্য। প্রেমে পড়ার বিষয়টিও অনেকটা এ রকম। কারণ প্রথম প্রেমের ক্ষেত্রে কখনো কখনো ভীতি থাকে, প্রত্যাখ্যাত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। প্রত্যাশা পূরণ হবে কি না, সে নিয়ে সংশয় থাকে। উদ্বেগ হচ্ছে প্রেমের সবচেয়ে বড় অংশ। বিশেষ করে প্রথম প্রেমের ক্ষেত্রে।’

সে কারণে প্রথম প্রেম আমাদের স্মৃতি খুব গভীরে প্রোথিত থাকে। আর কোনো প্রেমের স্মৃতিই আর এভাবে মনে দাগ কাটতে পারে না। বেশির ভাগ মানুষের ক্ষেত্রেই দেখা যায়, সবশেষে যে প্রেমটি জীবনে আসে, সেটিই শেষ পর্যন্ত স্থায়ী হয়। সেই প্রেমটিতেই সবচেয়ে বেশি যত্ন পায় মানুষ। তবু প্রথম প্রেমের স্মৃতি কখনো না কখনো মনে পড়েই যায়।

অ্যারন বলেন, এটা এ কারণে হতে পারে যে, বেশির ভাগ প্রথম প্রেম হয় বয়ঃসন্ধিকালে। যখন প্রবলভাবে হরমোনের পরিবর্তন হয়, পরিবারের সঙ্গে মনোমালিন্য হয়। মোট কথা, সব মানুষের জীবনেরই সেটা খুব গুরুত্বপূর্ণ সময়। আর সে কারণেই এই সময় হওয়া প্রেমের প্রভাব অনেক গভীরভাবে পড়ে জীবনে। একটা সময় এসে ভালোবাসার মানুষটা হারিয়ে যায়, তবে ভালোবাসা হারায় না। বরং মনের গভীরেই থেকে যায় আজীবন।


ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন :

টি মন্তব্য
মন্তব্যে প্রকাশিত যেকোন কথা মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। DeshReport.com-এর সম্পাদকীয় অবস্থানের সঙ্গে এসব অভিমতের কোন মিল নেই। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নিবে না

আরো সংবাদ...

মন্তব্য করুন